RSS

তারাভরা আকাশের নীচে

05 Jul
তারাভরা আকাশের নীচে

ইউরোপে আসা ইস্তক মিউজিয়াম গুলোতে যাওয়ার জন্যে মনটা হাঁকুপাঁকু করছিল। ছোটবেলা থেকে কয়েকজন শিল্পীর নাম শুনে আসছি যেমন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মোনে, ভ্যান গঘ। কেউ বোধহয় ছবির বই উপহার দিয়েছিল কোনো জন্মদিনে, সেখানে টুকরো-টাকরা কিছু ছবি দেখেছিলাম। জল-রং নিয়ে খেলা করতে দিব্যি লাগত, তাই বাবা-মা ছ বছর আঁকা শিখিয়েছিল, কিন্তু বায়োলজি পরীক্ষা ছাড়া সে শেখা কোনোদিন কোনো কাজে আসেনি। আরেকটু বড় হয়ে ছবি আঁকিয়েদের কথা পড়লাম ফেলুদাতে – তিনতোরেত্তো, বত্তিচেল্লি, মান্তেন্না, জান্তেন্না – মনে আছে তো? ছবির সঙ্গে আমার পরিচয় বাংলা সাহিত্যের হাত ধরেই। রামকিঙ্কর বেজকে নিয়ে একটা উপন্যাস পড়েছিলাম, লেখকের নাম মনে নেই, দুর্বল স্মৃতি ক্ষমাপ্রার্থী (সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’)। বাণী বসুর কয়েকটা লেখাতেও ইম্প্রেশনিস্ট ছবি, মাতিস, দালি, আরও নানারকম রঙের খেলা ছিল। তবে ছবি আঁকা মানে শুধু ক্যানভাসে রং বোলানো নয়, সেটাও আমাকে বাংলা সাহিত্যই শিখিয়েছে। যারা ছবি আঁকেন, তারা আকাশ-বাতাস, নিজের আশেপাশের ব্রহ্মান্ড আর নিজের জীবন দিয়ে রং তৈরি করেন, অন্য একটা জীবন ফুটিয়ে তোলার জন্যে। তাই বাংলা গল্পে যখন ভ্যান গঘ ফিরে এলেন, তখন সেটা না পড়ে তো কোনো উপায় ছিল না।

সত্যি বলতে কী, গতবারের শারদীয়াতে শ্রীজাতর প্রথম উপন্যাস একেবারে দাগ কাটেনি মনে। তখন ওঁকে প্রায় নাকচই করে দিয়েছিলাম গদ্যকার হিসেবে। ‘তারাভরা আকাশের নীচে’ বই আকারে বেরোবার পর বিষয়টা জেনে পড়তে ব্যাপক আগ্রহ জাগল। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। আমার কাছে এখনো অধরা মাধুরী। যখন প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামে গেলাম, পুরো ডাচ পেন্টিংয়ের গ্যালারি বন্ধ ছিল। সময়ের অভাবে মিউজি ডোরসেতে যাওয়া হয়নি। এরপর ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারিতে গেলাম, সেখানে ভ্যান গঘের একটিমাত্র স্কেচ বাঁধানো ছিল। বছর দশেক আগে যখন নিউ ইয়র্ক বেড়াতে গেছিলাম, ছাত্রাবস্থায় পয়সার চূড়ান্ত টানাটানি ছিল। মোমা ঘুরে দেখার মত সঙ্গীও ছিল না। কাজেই ‘দ্য স্টারি নাইট’ এখনো দেখা হয়নি। এ বাদে রইল অ্যামস্টারডামের ভ্যান গঘ মিউজিয়াম – এবারের গ্রীষ্মে সেটাই লক্ষ্য। যাঁরা এখনো ধরতে পারছেন না ব্যাপারটা কোনদিকে এগোচ্ছে, তাঁদের বলি যে ‘দ্য স্টারি নাইট’ হল ভ্যান গঘের অন্যতম বিখ্যাত ছবি, যাকে আধার করে শ্রীজাত ‘তারাভরা আকাশের নীচে’ উপন্যাসটি লিখেছেন।

ভ্যান গঘ তাঁর জীবনে দু হাজারেরও বেশি কাজ করেছেন, তবে সেটা মাত্র দশ বছরে। সাঁইত্রিশ বছরের একজন চিত্রকর কেন একদিন হঠাত আত্মহত্যা করলেন, তা বোঝার মত মন বোধহয় গোটা বিশ্ববাসীর এখনও তৈরি হয়নি। ভিনসেন্ট তাঁর আঁকিয়ে জীবনের প্রথমে প্যারিসে থাকতেন ভাই থিওর সঙ্গে। তাঁর ছবি আঁকা নিয়ে বাড়িতে অশান্তি ছিল, বাবা খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন, পুরো পরিবারে একমাত্র থিও অবিরাম তাঁকে সাহায্য আর সাহস যুগিয়েছিলেন। শ্রীজাত গল্প শুরু করেছেন এই অশান্ত ভিনসেন্টকে নিয়ে, যিনি প্যারিস থেকে একটু দূরে আর্ল-এ থাকতেন ছবি আঁকার জন্যে। তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু ও শিল্পী পল গগ্যাঁ মাঝে মাঝেই প্যারিস থেকে আর্ল যেতেন রং-তুলি-ক্যানভাস-টাকাপয়সা আর থিওর অজস্র ভালবাসা নিয়ে। ভিনসেন্টকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। ভালই ছিলেন, প্রচুর ছবি আঁকছিলেন, কিন্তু আচমকা যে কী হয়ে যায় – মুহূর্তের অন্ধ রাগে গগ্যাঁর ওপর রেগে গিয়ে ভিনসেন্ট নিজের কানের একাংশ কেটে ফেলেন। সেই থেকেই তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের টালমাটাল শুরু হয়। এরপর তিনি নিজেই অ্যাসাইলামে যান, সেখান থেকে বেরিয়ে এক গ্রামে বাড়ি ভাড়া করে থাকেন আঁকার জন্যে, এবং তার কিছুদিন পরেই আত্মহত্যা। এই গল্পের সমান্তরালে চলে আজকের যুগের একটি ছেলের গল্প, ঋত্বিক, যে ছবি আঁকতে চেয়েছিল। নানা কারণে তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সাঁইত্রিশ বছর বয়সে এসে তার জীবনটাও ভিনসেন্টের মত ওলট পালট হয়ে যায়। স্ত্রী শর্মিলা আর মনোবিদ রুখসার তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঋত্বিকেরও ভাই ছিল বড় প্রিয়, ভিনসেন্টের যেমন থিও। মায়ায়-ভালবাসায়-ঈর্ষায় দুজনেরই সম্পর্কগুলো কীরকম ঘেঁটে যায়। এরপর শর্মিলা মোমাতে নিয়ে যায় ঋত্বিককে, দ্যা স্টারি নাইট দেখাতে। সেখানে ভিনসেন্টের সঙ্গে দেখা হয় ঋত্বিকের, মুখোমুখি।

ছবি ভালবাসি বলে কিনা জানিনা, পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল শ্রীজাত যেন খানিকটা স্বপ্ন এঁকেছেন গল্পটা জুড়ে। ভিনসেন্টের জন্যে কষ্ট হয়, আবার ঋত্বিকের জন্যেও। দেশের আপামর জনতা ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ শুনলে এখনো নাক সিঁটকান, টুক করে ‘পাগল’ লেবেলটা সাঁটাবার জন্যে আঠা খোঁজেন। আমরা এখনো প্রশ্ন করে বেড়াই যে অ্যান্থনি বোর্দ্যান বা কেট স্পেডরা কেন আত্মহত্যা করেন। অতদূর যাচ্ছি না, হাতের কাছে দীপিকা পাডুকোনও ট্রোল হন। ‘কেন’র উত্তর কিন্তু সবসময় পাওয়া যায় না। ছোটবেলায় আমাকে বলা হয়েছিল, ‘সব কেনর উত্তর হয় না।’ বোধহয় বেশী প্রশ্ন করতাম বলে চুপ করানোর জন্যে। বড়বেলায় কথাটার সত্যতা বেশী বুঝতে পারছি। যেকোনো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে – সে ভ্যান গঘের মত চিত্রশিল্পী হোক বা ঋত্বিকের মত কর্পোরেট কর্মী। এই বিষয়টা নিয়ে এত সুন্দরভাবে লেখার জন্যে শ্রীজাতকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমাদের জানা-বোঝার মধ্যে এখনো যে কত ফাঁক রয়ে গেছে সেগুলো ভরার জন্যে এই গল্পটার দরকার আছে।

শুনেছি উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছেন কৌশিক সেন। পরের বার কলকাতায় গেলে যদি কপালে থাকে, দেখার ইচ্ছে রইল। আশা করি শ্রীজাত আরো গদ্য লিখবেন, আরো ভাল লিখবেন।

Advertisements
 
2 Comments

Posted by on July 5, 2018 in বই

 

2 responses to “তারাভরা আকাশের নীচে

  1. Arijit

    July 5, 2018 at 3:41 PM

    Besh besh. Boita porte hobe tahole, upanyas ta gotobar er Sharodiya Anandabajar e beriyechhilo.

     
  2. যযাতির ঝুলি

    August 29, 2018 at 11:39 PM

    হুম উপন্যাসটা পড়েছি। মন্দ লাগে নি।

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

 
যযাতির ঝুলি | বাংলা ব্লগ | Jojatir Jhuli | Bangla Blog

বাংলা কবিতা, বাংলা গদ্য.. মুচমুচে, খাস্তা, অনবদ্য। ছুটির দুপুরে হোক না যোগ.. যযাতির গল্প, ছড়া, ব্লগ।।

feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Scrapbook

A Public Performance of Derivative Thinking ;-)

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

The Greatbong Blog & Podcast

Dispensing unsolicited opinions since 2004

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

%d bloggers like this: