RSS

বিসর্জন

01 Dec

এই সমালোচনা লেখার জন্য কেউ আমাকে একটাও টাকা/ডলার/পাউন্ড/বিটকয়েন দেয়নি। সিনেমা বোদ্ধা/আঁতেল নই, শুধুমাত্র দর্শক হিসেবে বক্তব্য রাখছি।

ডিটেলঃ

ভাষা – বাংলা, রিলিজ তারিখ – ১৪ই এপ্রিল ২০১৭, দৈর্ঘ্য – দু ঘন্টা ৯ মিনিট, ছবি – রঙীন, সঙ্গীত – কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য, গল্প/চিত্রনাট্য/পরিচালনা – কৌশিক গাঙ্গুলী, অভিনয়ে – জয়া আহসান, কৌশিক গাঙ্গুলী, আবীর চট্টোপাধ্যায়, লামা, কমলিকা।

আলোচনাঃ

অন্য একটি ছবির সমালোচনাতে লিখছিলাম যে আজকাল বাংলায় মৌলিক ছবি খুবই কম হচ্ছে। এই ধারণাটাকে যে কৌশিক গাঙ্গুলী বার বার ভুল প্রমাণ করেন তার জন্যে অনেক অভিনন্দন ওঁর প্রাপ্য। কেয়ার অফ স্যার, খাদ, অপুর পাঁচালী, শব্দ – ওঁর পরিচালিত এই কটি ছবি মৌলিক এবং আমার বেশ প্রিয়। অল্প একটু দ্বিধা নিয়েই বলতে পারি যে এই লিস্টে এবার বিসর্জনও জায়গা করে নেবে। ব্যক্তিগত দ্বিধার কারণটুকু বাদ দিলে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বিসর্জন বেশ ভাল একটি ছবি।

দুই বাংলার সীমা ধরে চলতে শুরু করলে যে জায়গায় দুইয়ে মিলে এখনও এক হয়ে যায় বছরের একটা দিন – বিজয়া দশমীতে – সেটা টাকি-হাসনাবাদ-বসিরহাট সংলগ্ন ইছামতী নদী। যেহেতু আমার বাড়ি বসিরহাটে, ছোটবেলা থেকে অপেক্ষায় থাকতাম ওই একটা দিনের জন্যে, যখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বাড়ির সবার সঙ্গে বিসর্জন দেখতে পাব। দু-একবার নৌকোতেও চড়েছি বায়না করে, যদি পাশের নৌকো পাস করার সময়ে বাংলাদেশের পতাকাটা পরিষ্কার দেখতে পাই, মানুষগুলোকে একবার ছুঁতে পারি হাত বাড়িয়ে। তা সে ভীড়ে সেসব খুব একটা হয়নি। বাড়ির লোকেও ভীড়ের ভয়ে নৌকোয় চড়তে দেয়নি তারপর। কিন্তু প্রতিবার পাড়ে দাঁড়িয়ে গুণতাম বাংলাদেশের কটা ঠাকুর দেখতে পেলাম। মাঝনদীতে পতাকারা এক সময়ে মিশেও যেত, আর জলে পড়ার পরে সব ঠাকুরই এক। এই ভাবনাটাকেই কৌশিক গাঙ্গুলী সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন বিসর্জনে।

ছবির মুখ্য চরিত্রে জয়া আহসান, বাংলাদেশে বাস করা একজন দরিদ্র হিন্দু বিধবা (পদ্মা)। ঘটনাচক্রে সে প্রাণ বাঁচায় নদী পেরিয়ে আসা এক ভারতীয় মুসলমানের (নাসির), যে চরিত্রে আছেন আবীর। এই ত্রিভুজের অন্য কোণে রয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলী, সেই গ্রামেরই এক স্বচ্ছল হিন্দু ব্যবসায়ীর (গণেশ) চরিত্রে। নাসিরের সেবা করে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টায় পদ্মা যে খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চায়, তা ভাসিয়ে নিয়ে যায় গণেশ। সে কারুর ক্ষতি করতে চায় না, শুধু পদ্মাকে উপকারের ভারে জর্জরিত করে তাকে বিয়ে করতে চায়। এই অপেক্ষায় তার বয়স ও প্রেশার দুইই বেড়ে চলে, ক্যালেন্ডারে বিয়ের তারিখে লাল দাগ পড়তেই থাকে, কিন্তু কোনো তারিখই সফল হয়ে ওঠে না। এই টানাপোড়েনের মধ্যে নাসির আর পদ্মা একে অপরের প্রতি এক অসম টান টের পায়। ধর্ম-টর্মের কারণে অসম নয়, পদ্মা জানে নাসিরকে একদিন চলে যেতে হবে তার আয়েষার কাছে, ইন্ডিয়াতে। তবু সে কোন শর্তে গণেশকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায় সেটা জানার জন্যে ছবিটা দেখতে হবে।

যে দুজনের অভিনয়ের ওপর ছবিটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর তাঁরা হলেন জয়া আহসান ও কৌশিক গাঙ্গুলী। জয়া তবু তাঁর চেনা পরিবেশ পেয়েছেন, নিজের ভাষায় সংলাপ বলেছেন; কৌশিক গাঙ্গুলীর জন্যে হয়তো ব্যাপারটা আরেকটু কঠিন ছিল। তার মধ্যেই তিনি দেখিয়েছেন না-অভিনয় কাকে বলে। গণেশের চরিত্রে কখনোই তাঁকে বিসদৃশ মনে হয়নি। আমি চতুষ্কোণ ছবি থেকেই ওঁর অভিনয়ের ভক্ত। এছাড়া লামা (অরিন্দম হালদার) বলে ভদ্রলোক কেন যে আরো রোল পান না সেটাই আশ্চর্য্যের। দর্শককে একেবারে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখেন। আর জয়া! শুধু চোখ দিয়েই নয়, আলতো করে সংলাপ ভাসিয়ে দেওয়াতে অসামান্য পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ছবির ট্রেলার নিশ্চয়ই দেখেছেন, ওখানে একটা সংলাপ আছে যা মূল ছবিতে আরো মন ছুঁয়ে যায়, “সকালের বেধবার লগে রাইতের ছেনালের কোনো মিল নাই, না?”

এবার আসি দ্বিধার কথায়। আমার দ্বিধা আবীরকে নিয়ে। টাকি-বসিরহাটের নাসির আলির ওরকম নায়কোচিত চেহারা হতে পারে কিনা সে তর্কে যাচ্ছিনা। কিন্তু ভাষাটা মিলল না যে। ওই অঞ্চলের অন্তত আমার জেনারেশনের কেউও পুরো কলকাত্তাইয়া বাংলা বলে না। একটা টান আছে, কিছু নিশ্চিত রকমের শব্দের ব্যবহার আছে যেগুলো ছাড়া ওখানে কথোপকথন সম্ভব নয়। যেমন ‘কনে যাবা?’, ‘কী করবা?’, ‘খাতি যাবা নি?’ এর একটাও ভুল করেও নাসির আলির জবানে পেলাম না। সেটা নাহয় যারা সংলাপ বা গবেষণা করেছে তাদের দোষ। কিন্তু আবীর যে অভিনয়েও একেবারে জমাতে পারেননি। এমনিতে আমার ওঁকে দিব্যি লেগেছে অন্যান্য ছবিতে তাই এখানে একটু হতাশই হলাম। নাসির যে কখন কীভাবে পদ্মার প্রেমে পড়ল সেটা ছবিতে বোঝা গেল না। পরিচালক এভাবেই ভেবেছিলেন কিনা জানিনা কিন্তু ছবির প্রচারে এটাই বলা হয়েছিল যে ছবিটা নাসির আর পদ্মার প্রেমের গল্প। সেটা বললে অবশ্য ছবির কাটতি ভাল হবার কথা, কারণ বাংলার জনতা সাম্প্রদায়িক প্রেমের গল্প পর্দায় দেখতে ভালবাসে।
ছবির সঙ্গীত পরিচালক কালিকাপ্রসাদ, এবং তিনি অসামান্য কাজ করেছেন। আমার প্রিয় গান ‘একূল আর ওইকূল…‘, গেয়েছেন নচিকেতা চক্রবর্তী।

ছবির শেষের আগের দৃশ্যে নাসির ফিরে যাওয়ার পর পদ্মাকে যখন ভ্যানে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গণেশ (ও লামা), ওই একটি ফ্রেম বাঁধিয়ে রাখার মত। জয়াকে দেখে পাথরের প্রতিমা ছাড়া কিছু মনে হবে না। আবার তার পরেই গণেশকে বিয়ে করে তিনি সালংকারা স্ত্রী, ছেলের মা, বাড়ির বউ। এবং…পদ্মা। শেষেরটার তাতপর্য্য ছবিটা না দেখলে বুঝবেন না।

আমি কত দিলামঃ ৩.৫/৫ (পাঁচে সাড়ে তিন)

Advertisements
 
Leave a comment

Posted by on December 1, 2017 in সিনেমালোচনা

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

 
যযাতির ঝুলি | বাংলা ব্লগ | Jojatir Jhuli | Bangla Blog

বাংলা কবিতা, বাংলা গদ্য.. মুচমুচে, খাস্তা, অনবদ্য। ছুটির দুপুরে হোক না যোগ.. যযাতির গল্প, ছড়া, ব্লগ।।

feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Scrapbook

A Public Performance of Derivative Thinking ;-)

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: