RSS

কলকাতা কচকচি ৩ – চেনা-আধচেনা-অচেনা

09 May
কলকাতা কচকচি ৩ – চেনা-আধচেনা-অচেনা

(আগের পর্বগুলি এখানে)

কলকাতায় বহুকাল না থাকার দরুণ যেটা ভুলে গেছিলাম সেটা আমাদের ভাষায় ‘চেনা সিন্ড্রোম’। কলকাতা ও শহরতলির লোকেরা যে কোনো কাজে, যে কোনো জায়গায় গিয়ে আগে কোনো ‘চেনা’ লোক খোঁজে। আমি-আপনি হয়ত ‘চেনা’ বলতে বুঝি এরকম কেউ যার নাম-ধাম-ঠিকুজি-কুলুজি জানি, যার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়, অথবা নিতান্ত আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে কেউ। বেশ কিছু লোক অপর কিছু লোককে চেনা বলে পাকড়াও করেন, যার সঙ্গে হয়ত তার ছয় ডিগ্রীর চেয়েও বেশি সেপারেশন। সেই থিওরি নিশ্চয়ই আপনারা অনেকে জানেন যে পৃথিবীর যে কোনো দুজনের মধ্যে ‘বন্ধুর বন্ধু’ বা ‘চেনার চেনা’ বেরোতে মাত্র ছয় জন লাগে। অথবা শিবরামের সেই জ্যামিতিক অঙ্ক যেখানে বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু নিয়ে বেশ একটা জম্পেশ গল্প ছিল।

কলকাতায় থেকে হাড়ে হাড়ে যেটা বুঝছি সেটা হল বাঙালিরাই সিক্স ডিগ্রীস অফ সেপারেশনে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী। কিছুদিন আগে এক নিকট আত্মীয়কে নিয়ে সরকারি দফতরে গেছিলাম একটা কাজে (নাম বলব না, মাঝে মাঝে তাঁরাও আমার ব্লগ পড়েন)। যা হয়, এদিকে ফর্ম তোলা, জমা দেওয়া, ওদিকে অন্যান্য কাগজপত্রের খোঁজ করা, একতলা-দোতলা করতে করতে এই গরমে জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে যাওয়ার উপক্রম। চেষ্টা করছি যথাসম্ভব নিজেরা কাজটা করা যায় লালদার খপ্পরে না পড়ে। এর মধ্যে দেখি আত্মীয় এক ভদ্রলোককে প্রায় খপ করে ধরলেন।

“মশাই, আপনার বাড়ি অমুক ক্লাবের পাশে না?”

তিনিও উৎসাহিত হয়ে হাত পা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, আপনাকে কদিন আগে ওখানে দেখেছি মনে হচ্ছে।”
এদিকে এঁদের পরস্পর চেনাচেনির চক্করে কাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, বেলা গড়িয়ে প্রায় চারটে বাজে। আর কে না জানে, চারটে বাজলেই সরকারি দপ্তরে কেমন একটা ছুটির মেজাজ খেলে যায়। আমাদের আত্মীয়কে টুক করে খোঁচা মারছি যাতে তিনি তাড়াতাড়ি পরিচয় পর্ব সেরে ফেলেন। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়।

“আমি কিছুদিন আগে ওই ক্লাবে গেছিলাম একটা অনুষ্ঠানে, ওখানে মনে হচ্ছে আপনাকে দেখেছি।”
মানে চিন্তা করুন, একটা ক্লাবের অনুষ্ঠানে গিয়ে সেখানে পাশের বাড়ির একজনকে এক ঝলক দেখে মনে রাখা এবং পরে সেই পরিচয় ঝালানোতে কত প্রতিভা লাগে। আমার এরকম প্রতিভা নেই, সত্যি বলছি। আমি হয়ত দূর থেকে ভদ্রলোককে দেখে চেনা চেনা লাগলে বড়জোর ভাবতে পারি কোথায় দেখেছি। যাইহোক, তারপর সেই ভদ্রলোকের হাত ধরে এক ইঞ্চি কাজ এগোল আমাদের, কিন্তু সময়টা প্রচুর নষ্ট হল। যদিও আমাদের ভবি সেটা স্বীকার করলেন না। এই ঘটনাটা আধচেনা থেকে অচেনা ক্যাটেগরিতে পড়ে। এছাড়া চেনা থেকে আধচেনা ক্যাটেগরি অনেক বড়।

আরেক আত্মীয়কে দেখতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে গেছিলাম। সেখানকার হালচাল-কাজকারবার বেশ নতুন, শহরতলির লোকেদের কাছে সেটা বেশ একটা অভিনব ব্যাপার। রিসেপশনে সুন্দরী বসে ঢাউস স্মার্টফোনে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলেন, নীল শাড়ি ইউনিফর্মের সাথে ম্যাচ করে নীল আইশ্যাডো – এসব দেখতে রুগীর বাড়ির লোক খুব একটা অভ্যস্ত নন। আমাদের আত্মীয় সরকারি কর্মচারী, তাই সরকার থেকে ইন্স্যুর‍্যান্স পান। সেসব নিয়ে কথাবার্তা বলতে হাসপাতালের দপ্তরে সবাই গেছি। আত্মীয়ের শ্বশুরমশাই বললেন, “আরে এদের কিছু বলতে হবে না। এই হাসপাতালের কর্পোরেট ডেস্কে আমাদের এক চেনা ছেলে বসে। সে সব ব্যবস্থা করে রাখবে বলেছে।” আমার সন্দেহ হওয়াতে জিজ্ঞ্যেস করলাম কীরকম চেনা। তাতে উত্তর এল, রুগীর কলীগের অমুকের তমুকের বোনের ন’ভাইপো গোছের কেউ। তিনি আবার এঁদেরকে ‘দেখবেন’ বলে নাচিয়ে দিয়ে ছুটিতে গেছেন। পরের দিন যথারীতি তাদের ডেস্ক ঘুরে অনেক স্টেপ পেরিয়ে তবে কাগজপত্র বের করা গেল। ন’ভাইপোর ভরসায় থাকলে আর রুগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে হত না!

ব্যাপারটা এরকম জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে আমি এখন রাস্তায় বেরোলে প্রতিটা লোকের দিকে তাকিয়ে ভাবি, এর সঙ্গে আমার কয় ডিগ্রী অফ সেপারেশন। সেটা এক থেকে দুইয়ের মধ্যে থাকলে মনে হয় এক্ষুণি কেটে পড়ি। নইলে সেই, “আরে তুমি! মনে আছে তো আমি কে? সেই অমুকের তমুকের ভায়রাভাই হই।” তারপর তার খপ্পরে পড়া এবং অবিরাম প্রশ্নবাণ। তার চেয়ে আমার অচেনা লোকেরাই ভাল।

পুনশ্চঃ ফেসবুকে এক আত্মীয় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল। কীরকম আত্মীয় জানেন? শ্বশুরমশাইয়ের মামার শালার নাতি। কয় ডিগ্রী সেপারেশন হল সেটা আপনারাই হিসেব করে নিন।

Advertisements
 
2 Comments

Posted by on May 9, 2015 in কলকাতা কচকচি

 

Tags: , , , , , , , , , , ,

2 responses to “কলকাতা কচকচি ৩ – চেনা-আধচেনা-অচেনা

  1. roshni

    May 13, 2015 at 9:31 AM

    At least apnake primary school er classmate er shashuri friend request pathayni. 😛

     
  2. Pabitra Kaity

    May 23, 2015 at 11:17 AM

    Such A very Good Post. Happy to Read This…. Thankyou! : Admin of Bangla Bhumi

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: