RSS

তিনশো বছর পুরনো একটি দোলযাত্রা

17 Mar

আজ দোল। বসন্ত তো নেই বললেই হয়, এখন দোলও আসে গরমে। প্রায় তিনশো বছর আগে শুরু হওয়া একটি বিখ্যাত দোলযাত্রার গল্প শোনাই। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমায় গোটা বঙ্গদেশে কয়েকটি এলাকার দোলের মেলার জগতজুড়ে নাম, যেমন – রাজশাহীর ভবানীপুরের রাসমেলা, পটুয়াখালীর কুয়াকাটার রাসমেলা, সাতক্ষীরা জেলার মুন্সীগঞ্জ ও কাটুনিয়া রাজবাড়ির দোলপূর্ণিমার মেলা, পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর ও কালনার রাসমেলা তিনশো বছরেরও পুরনো। এর মধ্যে কাটুনিয়া রাজবাড়ির এক সদস্যের সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছি, যিনি আজ থেকে গোটা ষাটেক বছর আগে এই মেলা এবং পুজো চাক্ষুষ দেখেছেন বেশ কয়েকবার তাঁর ছোটবেলায়। শুনে নিই তাঁরই জবানীতে, পঞ্চাশের দশকে কাটুনিয়া রাজবাড়ির বিখ্যাত দোলপূর্ণিমা মেলা কেমন হত।

——————-

এটা কাটুনিয়া রাজবাড়ির ঠাকুর নয়। ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া।

এটা কাটুনিয়া রাজবাড়ির ঠাকুর নয়। ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া।

কাটুনিয়া রাজবাড়ির কুলদেবতা ছিলেন গোবিন্দদেব (এবং রাধারানী)। দোলের আগের দিন তাঁর অভিষেক হত। বিরাট একটা পরাত ছিল, সেই পরাতের মধ্যেই ডাবের জল, দুধ আর ঘি রাখা থাকত। সেই পরাতের মধ্যে বসিয়ে প্রথমে ডাবের জল দিয়ে স্নান করিয়ে গা মুছিয়ে দেওয়া হত, তারপর দুধ এবং ঘি দিয়ে একইভাবে স্নান করিয়ে মুছিয়ে দেওয়া হত। স্নানধারায় গড়িয়ে পড়া এই তিনটে পদার্থ মিশিয়ে পরে চরণামৃত তৈরি হত। এই অভিষেক হত মন্দিরের বাইরের বারান্দায় ঠাকুর বসিয়ে। এরপরে ঠাকুর আবার ঘরে ফিরে যেতেন, রোজকার নিয়মে ভোগ-শয়ান ইত্যাদি হত, তবে দোলের আগের দিন একটা স্পেশাল ভোগ হত। সন্ধ্যেবেলা আরতি এবং ঠাকুরকে নতুন জামাকাপড় পরানো হত।


রাত্রি প্রথম প্রহর থেকে দ্বিতীয় প্রহরের (দশটা থেকে বারোটা) মধ্যে ঠাকুরের দোলযাত্রা শুরু হত। প্রায় মাইলখানেক রাস্তা ধরে যাত্রা হত। ঠাকুরের মূর্তি ভীষণ ভারী ছিল বলে শুধু রাজবাড়ি সদস্যরাই তাঁর ভার বইতেন, আমিও নিয়েছি। আনুষঙ্গিক ছোট মূর্তিগুলো বাড়ির বাচ্চারা নিত। লাঠিয়ালরা পাশ থেকে লাঠি দিয়ে ঘিরে রাখত ঠাকুর এবং বাড়ির লোকেদের, তবে মেয়েরা এই যাত্রায় যোগ দিতেন না। রাজবাড়ির মাঠে আগে থেকে বুড়ির ঘর করা থাকত, তার চারপাশ ঠাকুর নিয়ে প্রদক্ষিণ করে এসে ঠাকুরের সামনে বুড়ির ঘর জ্বালানো হত। যতক্ষণ বুড়ির ঘর পুরো পুড়ে না যেত, ঠাকুরকে কোলে নিয়ে বাড়ির লোকেদের ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। তারপর বিশাল মাঠের মধ্যে দুখানা দোলপিঁড়ি তৈরি করা হত মাটি দিয়ে, বড়টা গোবিন্দদেবের জন্যে আর ছোটটা বাকি অন্যান্য ঠাকুরের জন্যে। সেই দোলপিঁড়ি প্রদক্ষিণ করে বাড়ি ফিরে ঠাকুরকে মন্দিরে ফেরত রাখা হত। তারপর ঠাকুরকে শয়ান দিয়ে ঘুম পাড়ানো হত। রাত্রি তিনটে থেকে চারটের মধ্যে আবার দোলযাত্রা হত, ঠাকুরকে নিয়ে যাওয়া হত দোলপিঁড়িতে। ততক্ষণে মাঠে হাজার হাজার লোক চলে আসত। দূরদুরান্ত থেকে লোকে গোরুর গাড়িতে আসত, সারারাত তার ছইয়ের ভেতর বসে অপেক্ষা করত কখন ঠাকুর এসে বসবেন।

দোলপিঁড়িকে প্রদক্ষিণ করে তার ওপর দোলনার ভেতর ঠাকুরকে বসানো হত। সেই জন্যেই বোধহয় উৎসবের নাম ‘দোল’। পাঁজিতে সেদিনের ব্রাহ্মমুহুর্ত আগে থেকে দেখে রাখা হত। সেই মুহুর্তে পুরোহিত এবং বাড়ির কর্তা মিলে সেই দোলনা একটু নাড়িয়ে দিতেন, তারপর সেটা নিজে থেকে কিছুক্ষণ দুলত। ঠাকুরের দোল থেমে গেলে হরির লুট দেওয়া হত, ওপর থেকে বাতাসা ছুঁড়ে দেওয়া হত। তাই নিয়ে লোকের মারামারি লেগে যেত। একটা গোটা বাতাসা কেউ পেলে সে মনে করত সেটা তার বিরাট সৌভাগ্য। এর পাশাপাশি সেই মাঠে মেলা বসে যেত। বহু বছর আগে দুমাস ধরে সেই মেলা চলত। পরে কমতে কমতে একমাস আর পনেরো দিনে এসে ঠেকেছিল। মেলায় সার্কাস, সিনেমা, দোকানপাট সব থাকত।

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

হরির লুট শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুকনো লাল আবির দিয়ে রঙ খেলা শুরু হত। কেউ বদমায়েশি করে জল রঙ দিলে তাকে বেত মারা হত। যে যাকে যত খুশি শুকনো আবির দিতে পারে, কিন্তু জল রঙ চলবে না। বাইরের লোকেরা রাজবাড়ির লোকেদের গায়ে রঙ দিতে সাহস পেত না, তাঁরা নিজেদের মধ্যে খেলতেন। রাজবাড়ির সমস্ত আত্মীয়স্বজন এই উপলক্ষে আসতেন কাটুনিয়াতে। এর পর রাজবাড়ির মেয়েরা ভেতরের পুকুরে আর পুরুষরা বাইরের বড় পুকুরে স্নান সেরে নিতেন। বাইরের লোকেদের সেই পুকুরে নামা বারণ ছিল। দশটা কলসি ওখানে রাখা থাকত আর কিছু লোক। বাইরের কেউ অনুরোধ করলে তাদেরকে জল তুলে দেওয়া হত স্নানের জন্যে।

ছবি সৌজন্যেঃ chilliandmint.com

ছবি সৌজন্যেঃ chilliandmint.com

মোটামুটি সকাল দশটার মধ্যে দোল খেলা শেষ হয়ে যেত। তারপরে আসতে শুরু করত মাছ। রাজবাড়ির রান্নাঘরের সামনে এক বিশাল বারান্দা ছিল। সেখানে এক এক করে মাছ আসতে থাকত – ভেটকি, পার্শে, রুই, কাতলা – যে যা পারত এনে ভেঁট দিত। তাদের দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করা হত তখন। সেই বারান্দায় লাইন দিয়ে পঞ্চাশ-ষাট জনের একেকটা ব্যাচ বসত। আট-দশজন ঠাকুর থাকত রান্নার জন্যে। মেনুতে থাকত ডাল, তিন-চার রকমের নিরামিষ তরকারি আর বিভিন্ন রকমের মাছ। এই খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে বেলা পাঁচটা বেজে যেত। দোলের আগের দিন রান্নাঘরে ভিয়েন বসত। সেখানে পান্তুয়া বানানো হত। রাত্রে থাকত লুচি, ছোলার ডাল আর কুমড়োর ছক্কা। অন্য কোনো মিষ্টি হত না, শুধু রাশি রাশি পান্তুয়া। দোলের দিন এই পান্তুয়া সবাইকে শেষ পাতে দেওয়া হত।
এই ছিল কাটুনিয়া রাজবাড়ির দোলযাত্রা।

ছবি নিজস্ব

ছবি নিজস্ব

লেখক পরিচিতিঃ প্রবীর কুমার রায় হলেন রাজা বসন্ত রায়ের অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ। তিনি কাটুনিয়া রাজবাড়িতে তাঁর ছোটবেলা কাটিয়েছেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসার। সেই দোলও নেই, সেই রাজবাড়িও নেই। স্মৃতি নিয়েই দিব্যি আছেন।

Advertisements
 
4 Comments

Posted by on March 17, 2014 in প্রবন্ধ

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , ,

4 responses to “তিনশো বছর পুরনো একটি দোলযাত্রা

  1. অরিজিত

    March 18, 2014 at 9:42 AM

    দারুণ। পড়ে দিব্যি মনটা রঙিন হয়ে গেল। 🙂

     
  2. Sourav Ghosh

    March 21, 2014 at 10:38 PM

    Asadharon! Banglay ekta blog maintain korchen dekhe avivuto. banglay likhte parlam na bole sorry. Btw ki software use koren bangla lekhar janne?

     
    • PRB

      March 25, 2014 at 3:16 PM

      Onek dhonyobaad porar jonyo 🙂 ami unicode er Avro keyboard use kori.

       
  3. সূর্য গুপ্ত

    May 29, 2014 at 7:23 PM

    সুন্দর লেখা – দোল আমার চিরকালের প্রিয় উতসব – আপানার ব্লগ অতি আকর্ষণীয়।

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: