RSS

বেঁচে থাকা আর অভিনয়

18 Dec

ঘুমের মধ্যে আধো-অন্ধকার এক অনুভূতিতে মৈত্রেয়ীর মনে হল কোথায় যেন সানাই বেজেই যাচ্ছে একটানা। ঘুমের মধ্যেই তিনি ভাবলেন, তাহলে কি ইমলির বিয়েটা শুরু হয়ে গেল? কিন্তু তাঁকে ছাড়া তো অনুষ্ঠান আরম্ভ হবে না, তিনি তো মেয়ের মা। এই অবেলায় তিনি ঘুমোচ্ছেন আর সবকিছুতে দেরী হয়ে যাচ্ছে ভেবে মৈত্রেয়ী ধড়মড় করে উঠে বসলেন। উঠে দেখলেন এটা তাঁর নিজের ঘর নয়। চারিদিক ভারী পর্দাঘেরা ছায়া ছায়া একটা হোটেলের ঘর। দু’মিনিট লাগল চোখ সইয়ে নিতে। ঘড়ি দেখলেন, এখনো সকাল রয়েছে। সবে এগারোটা বাজে, কিন্তু ঘরের ভেতর আলোছায়া দেখে সময় বোঝা যাচ্ছে না। মাত্র ঘন্টা তিনেক আগেই তাঁরা লোনাভলার এই গেস্ট হাউসে চেক-ইন করেছেন। তাঁরা অর্থে মৈত্রেয়ী ও তাঁর স্বামী অরুণোদয়। বম্বে থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিলেন গাড়িতে, ট্র্যাফিক আর ভারী বর্ষা এড়াতে। আটটা নাগাদ পৌঁছে চা খেয়ে মৈত্রেয়ী একটু রেস্ট নেবার জন্যে শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছেন বুঝতে পারেননি। অরুণোদয় অবশ্য জেগেই ছিলেন, বাইরের ঢাকা বারান্দায় বসে প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। অথবা, খবরের কাগজ হাতে নিয়ে শুধুই বৃষ্টি দেখছিলেন।

ঘুম থেকে উঠে চোখেমুখে জল দিয়ে মৈত্রেয়ীও বারান্দায় গিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন।

“অনেকক্ষণ ঘুমোলে, শরীর ঠিক আছে তো?” স্ত্রীকে জিজ্ঞ্যেস করলেন অরুণোদয়।

“হ্যাঁ, এমনি টায়ার্ড লাগছিল।”

দু’পংক্তি কথার পরেই আবার যে যাঁর জগতে ফিরে গেলেন। সারাদিনে শুধুমাত্র এরকম প্রয়োজনীয় দু’একটা কথা বলে যে তাঁরা কতদিন কাটিয়েছেন তার কোনো হিসেব নেই। মৈত্রেয়ীর বয়স এখন ছাপ্পান্ন, আর অরুণোদয়ের ষাট। দাম্পত্যজীবনের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্ণ করেছেন এই কদিন আগেই। কর্তা রিটায়ারও করেছেন মাসখানেক হল, মেয়ের বিয়ের দুদিন আগে। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ইমলি, থাকে ইতালিতে। স্কলারশিপ পেয়ে রোমান ইতিহাসের ওপর রিসার্চ করতে গিয়েছিল, এখন ওখানেই থিতু হতে চায়। আর বিয়েও করল একজন ইতালিয়ানকে। সেই উপলক্ষেই গত এক মাস ধরে রীতিমত ঝড় বয়ে গেল বাবা-মার ওপর। অরুণোদয়ের কোনো অসুবিধা হয়নি মেয়ের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে। তিনি মেয়ে-অন্তপ্রাণ, যদিও তার বহিঃপ্রকাশ খুবই সীমিত। তবে মৈত্রেয়ী একটু চমকেছিলেন। মেয়ে সাহেব বিয়ে করবে সেটা তার ব্যাপার বটে, কিন্তু সে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা তাই নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। ছাব্বিশ বছর দেশে মানুষ হয়ে বাকী জীবনটা বিদেশে কাটানো খুব একটা সোজা নয়। তাছাড়া বিদেশী বর, সে কতদিন টিঁকবে কে জানে। তিনি আবার শুনেছিলেন ইতালিয়ানরা নাকি আজন্ম-রোম্যান্টিক হয়। নিজের আশঙ্কার কথা তিনি স্বামীকে বলতে গেছিলেন দু’একবার। তাতে উত্তর এসেছিল, ‘মেয়ের ওপর আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে। তাছাড়া সে যদি জীবনটা নিজের মত করে বাঁচতে চায়, ক্ষতি কী? সবার তো সে সৌভাগ্য হয় না।’

এই ভদ্রলোককে মৈত্রেয়ী এখনো ঠিক বুঝতে পারেন না। এত বছর ধরে ঘর করছেন, একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ সবই জানেন, কিন্তু ওইটুকুই। দুজন অচেনা মানুষ এতদিন একসাথে থাকলে এসব অভ্যেস হয়েই যায়। অভ্যেসের বাইরে যে সম্পর্কটা থাকা উচিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, ওঁদের সেটা কোনোদিনই গড়ে ওঠেনি। অরুণোদয় স্বভাবত বেশ চাপা, মৈত্রেয়ীও তেমন উচ্ছ্বল নন। তাছাড়া বিয়ে হয়ে শ্যামপুকুর থেকে বান্দ্রা অব্দি জায়গা বদলটা মানাতেও অনেক সময় লেগে গেছে তাঁর। কিন্তু এগুলো কোনোটাই আসল কারণ নয় অভ্যেসের বাইরে ভালবাসা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে। আসল কারণটা জানেন মৈত্রেয়ী আর হয়তো জানতেন ওঁর মা-বাবা। মেয়ের ভালবাসার মানুষকে পছন্দ ছিল না বলে সাত তাড়াতাড়ি তাকে সুদূর বম্বেতে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। এটা ভাবলেন না যে মেয়ে হয়তো কোনোদিনই স্বামীকে সম্মানটুকুর বেশী নিজের মনটা দিতে পারবে না। ওঁরা পুরনো দিনের মানুষ, ভেবেছিলেন বিয়ে হলে ওসব কলেজি প্রেমের ভূত ঘাড় থেকে ঠিক নেমে যাবে। সম্বন্ধটা এসেছিল মৈত্রৈয়ীর পিসতুতো দিদির মারফত। জামাইবাবুর বম্বে-প্রবাসী আত্মীয়রা একমাত্র ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজছিলেন। মৈত্রৈয়ীর বাবা-মাও এই সুযোগকে সুবর্ণ ভেবে হাতছাড়া করতে চাননি। একমাসের মধ্যে কথাবার্তা পাকা করে বিয়ের সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন।

স্বামীকে মৈত্রৈয়ী ছাদনাতলাতেই প্রথম দেখেন। বাড়ির লোকের চাপে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ক্ষত তখনও শুকোয়নি। অনিচ্ছাকৃতভাবে শুভদৃষ্টির সময় চোখ খুলে দেখলেন সামনে একজন সৌম্য চেহারার ভদ্রলোক গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছেন, যেন বলতে চাইছেন, ‘ভয় পাবেন না, আমি তো আছি।’ ওই চোখদুটোর ভরসায় আর বাড়ির লোকের চাপে মৈত্রেয়ী বিয়েটা করেই ফেলেন। বিয়ের পরে বম্বে গিয়ে বেশ অসুবিধে হয়েছিল। মরাঠি তো দূরঅস্ত, শ্যামপুকুরের মেয়ে হিন্দির ‘হ’ও বলতে পারতেন না। বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি আর স্বামী মাত্র। মৈত্রেয়ী ছোটবেলা থেকে সংসারটাই মন দিয়ে করতে চেয়েছিলেন , কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখলেন করার বিশেষ কিছু নেই। শ্বশুরমশাই সারাদিন ছাদের ওপর বাগান নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন, শাশুড়ি রান্নাবান্না বাজারহাট সবই নিজে করতেন আর অরুণোদয় বোধহয় অফিসে থাকাটাই বেশী পছন্দ করতেন। যথাক্রমে শাশুড়ি ও শ্বশুরমশাই বয়স হয়ে মারা গেলেন, কালের নিয়মে মেয়ে বড় হতে লাগল আর তাকে নিয়ে মৈত্রেয়ী ব্যস্ত হয়ে রইলেন।

যেহেতু নিজের অপছন্দে বিয়ে করেছিলেন, স্বামীকে কোনোদিনই সেভাবে ভালবাসতে পারেননি মৈত্রেয়ী। ভদ্রলোকের শান্ত স্বভাব আর কর্তব্যপরায়ণতার জন্যে চিরকাল শ্রদ্ধা করে এসেছেন তাঁকে। নিজেও কখনও সংসারে কোনো কর্তব্যের ত্রুটি রাখেননি তিনি। তবে আজ জীবনের মধ্যাহ্নে পৌঁছে মনে হচ্ছে জীবনটা এমনিই বয়ে গেল, দিশাহীনভাবে। যাকে চেয়েছিলেন তাকে পাননি, আর যাকে পেলেন তাকে পেয়েও কোনো লাভ হল না। বাবা-মা যেরকম ভেবেছিলেন, কই সেরকমভাবে সময়ের সঙ্গে ক্ষত তো শুকোলো না। উলটে এমন এক বাসার মধ্যে পড়লেন যেটা তিনি না গড়ে অন্য কেউ গড়লেও কোনো তফাত হত না। সত্যি, অরুণোদয়ের সঙ্গে যদি অন্য কারুর বিয়ে হত তাতে কি ওঁর কিছু এসে যেত? উনি তো স্বভাবতই খুব চুপচাপ ধরণের। নিজের মনে কথা কি উনি অন্য কারুর সঙ্গে ভাগ করে নিতেন? উনি কি কখনও বুঝতে পেরেছেন স্ত্রী কেন সারাজীবন ওঁর প্রতি উদাসীন রয়ে গেলেন?

আজ হঠাৎ ভীষণ প্রগলভতায় পেল মৈত্রেয়ীকে। কোনোদিন টুপ করে মরে-টরে যাওয়ার আগে খোলাখুলিভাবে কথা বললে কীই বা এমন ক্ষতি হবে আর এই বয়সে? স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আচ্ছা, তুমি হঠাৎ আমাকে বিয়ে করতে গেলে কেন?”

ভুরু কুঁচকে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন অরুণোদয়। এত বছর পরে এ আবার কী অদ্ভুত প্রশ্ন! স্ত্রীকে তিনিও ঠিক বুঝতে পারেন না। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন একটা স্পষ্ট উদাসীনতা, বোধহয় খানিকটা শোকও ছিল মেয়েটির। কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু বলেনি বটে, কিন্তু আত্মীয়দের কাছে কানাঘুষোয় দু একবার শুনেছিলেন ওর প্রেমিকের কথা। তিনি কিছু জিজ্ঞ্যেস করেননি কারণ তাঁর নিজের কাছেও বিয়েটা ছিল শুধু দায়বদ্ধতার। মোটেও তিনি এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাননি, বাড়ির লোকের জোর জবরদস্তিতে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে স্ত্রীয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই অরুণোদয়ের। কেউ বলতে পারবে না মৈত্রেয়ী কোনো কর্তব্যে ত্রুটি করেছেন, আত্মীয়স্বজনরা ওঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, মেয়েকেও বলা যায় প্রায় একা হাতেই মানুষ করেছেন, তিনি কোনোদিন বেশী সময় দিতে পারেননি। আজ পঁয়ত্রিশ বছর বাদে তাঁরা দুজনেই সংসারের দায়ভারমুক্ত, তাই মৈত্রেয়ীর প্রশ্নের উত্তর তিনি নির্দ্বিধায় দেবেন ঠিক করলেন।

“বাবা মা সম্বন্ধ দেখে দিয়েছিলেন, তাই করেছিলাম।”

“তার মানে তোমার আমাকে পছন্দ ছিল না।”

“পছন্দ করার সময় পেলাম কোথায়? তোমাকে তো আমি বিয়ের দিনই প্রথম দেখলাম।”

“আমাকেও তোমার ফটো দেখানো হয়েছিল একবার, তারপর সোজা ছাদনাতলায়।”

“তুমি কি নিজের ইচ্ছেয় বিয়েটা করেছিলে, মৈত্রেয়ী?”

এবার তিনি একটু চমকালেন। এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে সেটা কখনও ভাবেননি। বিয়ের পরে ধাক্কা সামলে উঠতে বেশ কিছুদিন লেগেছিল তাঁর। আশ্চর্য এই যে শ্বশুর-শাশুড়ি কখনও জিজ্ঞ্যেস করেননি বৌমা সবসময়ে আনমনা হয়ে থাকে কেন। হয়ত ভেবেছিলেন নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে অস্বস্তি লাগছে। শাশুড়ি তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে বম্বে ঘুরিয়েছিলেন। স্বামীর সঙ্গে একবারই একটু সখ্যতা হয়েছিল মৈত্রেয়ীর, সেটা ইমলির জন্মের পর। মেয়েকে নিয়ে যতটুকু সময় পেতেন, মেতে থাকতেন অরুণোদয়। রাত্রে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতেন বারান্দায় পায়চারি করতে করতে। সেই সময়ে স্ত্রীর সঙ্গেও খানিকটা বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তাঁদের জীবনের অসামঞ্জস্যকে মেয়ে এসে কোনো এক সূক্ষ্ণ তারে মিলিয়ে দিয়েছিল কিছুদিনের জন্যে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈত্রেয়ী বললেন, “না।” সত্যিটাকে স্বীকার করার সময় এসে গেছে বোধহয়।

“আমারও তাই মনে হয়েছিল। কেন করলে তাহলে?”

“বাবা-মার চাপে, আত্মীয়দের জোরাজুরিতে। প্রায় ধরে নিয়ে গিয়ে পিঁড়িতে বসিয়ে দিয়েছিল।”

“বারণ করতে পারতে, নিজের পছন্দের কাউকে বিয়ে করতে পারতে।”

“করতে দিল না, সেই জন্যেই তো। আমার পছন্দের মানুষকে তাদের পছন্দ হল না। তাই কলকাতার বাইরে সম্বন্ধ খুঁজে বিয়ে দিয়ে দিল।”

“তুমি প্রতিবাদ করোনি?”

“করেছিলাম, কেউ শোনেনি। আর আমি কাপুরুষের মত পালিয়ে বিয়ে করতে চাইনি, তাই মেনে নিয়েছিলাম।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলতে পেরে খুব হালকা লাগছিল মৈত্রেয়ীর। এতদিনের চাপা ক্ষোভে পলি পড়ে গিয়েছে বেশ খানিকটা, শুধু আফশোস রয়ে গেছে। এই বিষয়ে তিনি আগে কোনোদিন কারুর সাথে মন খুলে কথা বলতে পারেননি। কলকাতা ছেড়ে আসার পর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর বম্বেতে আজ অব্দি সংসারের গন্ডি ছেড়ে বেরোতে পারেননি যে নতুন করে বন্ধু তৈরি হবে। পালিয়ে না গিয়ে মৈত্রেয়ী চেয়েছিলেন তাঁর প্রেমিক মানস এগিয়ে বাড়ির লোকদের কনভিন্স করুক, কিন্তু সে পারেনি। হয়ত তার সাহসে কুলোয়নি। শুনেছিলেন তাঁর বিয়ের দিন চোরের মত কলকাতা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সে। আজ হয়ত লোকটার সাথে দেখা হলে অনুকম্পা হবে। তাই তিনি আর বর্তমানের সঙ্গে দেখা করতে চান না, অতীতকেই মনের চিলেকোঠায় রেখে বাঁচতে চান।

“আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই, ধরে নাও কিছু কনফেস করতে চাই।” অরুণোদয়ের কথায় চমক ভাঙল তাঁর।

“এখন তো ইমলির বিয়ে হয়ে গেছে, আমার সব দায়িত্ব প্রায় শেষ। এবার তুমি আমাকে ছুটি দাও।”

চূড়ান্ত অবাক চোখে চাইলেন মৈত্রেয়ী। তিনি এঁকে ছুটি দেওয়ার কে? তিনি নিজেই তো এই সংসারের বন্ধনে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে আছেন।

“কী বলতে চাইছ আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”

“আমার আরেকটা পরিবার আছে, পুণেতে। সেটাই আমার নিজের সংসার। এত বছর আলাদা ছিলাম, এখন আমি সেখানে গিয়ে থাকতে চাই।”

এতক্ষণের সব কথা ভুলে গিয়ে মৈত্রেয়ী হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন স্বামীর দিকে। আরেকটা সংসার? এসব কবে হল, কী করে হল? আর তিনি কিছু জানতেও পারলেন না!

প্রায় তাঁর মনের কথাটা পড়ে নিয়ে অরুণোদয় বললেন,
“আমার এই সম্পর্ক তোমার চেয়েও পুরনো। পুণেতে আমি ফার্গুসন কলেজে পড়তাম। তখন আমার ক্লাসমেট ভাবনার প্রেমে পড়ি। তিন বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর খেয়াল হয় এবার বাড়িতে জানাতে হবে। আমার বাবা-মাকে তুমি কতটা চিনেছিলে জানিনা, কিন্তু আমি চিনতাম। তাঁরা অবশ্যই একটি মরাঠি মেয়েকে মেনে নিতে চাননি। কিছুতেই বিয়েতে রাজী হলেন না। উলটে কান্নাকাটি করে আমাকে তোমার সাথে বিয়ে করতে বাধ্য করলেন প্রায়। ভাবনা কেন জানিনা মেনে নিয়েছিল এইসব। ওর বাড়িতে বিশেষ কেউ ছিল না আপত্তি করার মত। তাই ও আরো পড়াশোনা করল, তারপর বহুদিন ধরেই পুণের একটা কলেজে পড়ায়। আমি মাসে দুমাসে অফিস ট্যুরের নাম করে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। আমাদের এক ছেলেও আছে, যদিও সে জ্ঞান হতেই জানে তার বাবা মারা গেছে। তারপরেও আমি ভাবনার সাথে লুকিয়ে দেখা করেছি। ছেলে এখন চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছে, ওখানেই সেটল করবে। তাই এই শেষ বয়সটুকু আমি জীবনের সবচেয়ে প্রিয় নারীর সঙ্গে কাটাতে চাই। এর বদলে তুমি যা চাইবে আমি দিতে রাজী আছি। শুধু লিগ্যালি আমাকে মুক্তি দাও।”

এই পর্যন্ত শুনে মৈত্রেয়ী স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। এতদিন তিনি শুধু নিজের দিকটা দেখেছেন, নিজেকে বঞ্চিত ভেবে এসেছেন। অপর পক্ষে যে এত চমক অপেক্ষা করে থাকতে পারে তাঁর জন্যে সেটা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেননি।

“তুমি এত কিছু চেপে এতদিন শুধু সংসারে পুতুল খেলার অভিনয় করছিলে আমার সঙ্গে?”

“তুমিও কি তাই করোনি? আমরা দুজনেই একে অপরের সাথে অভিনয় করে গেছি এত বছর ধরে। এতে লাভ কারুর হয়নি, বরঞ্চ ক্ষতি হয়েছে অনেকের। শুধু বাড়ির লোকের সম্মান রাখতে নিজেদের জীবনগুলো নষ্ট করেছি। তুমি তো সুখী হওনি আমার সাথে থেকে মৈত্রেয়ী, আমিও ভাবনার সঙ্গ অনেকগুলো বছর পাইনি।”

সব বুঝছিলেন মৈত্রেয়ী, কিন্তু তাঁর ভেতরটা কাঁচের মত টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। শেষটায় সবাই সবকিছু পেল, শুধু তিনি একেবারে একা হয়ে গেলেন। এবার তিনি কোথায় যাবেন, কী করবেন? তাঁর তো আর কেউ নেই এই মানুষটি ছাড়া। এতগুলো বছর যে সংসারকে তিনি শুধু দায়বদ্ধতা ভেবে এসেছেন, আজ সেই সংসারের কর্তা ছাড়া পৃথিবীতে আপনজন বলতে তাঁর কেউ নেই। বাবা-মায়ের তিনি একমাত্র সন্তান ছিলেন, তাঁরা চলে যাওয়ার পর কলকাতায় শরিকি বাড়ির অংশ বেচে দিয়েছিলেন। আর তাছাড়া কলকাতা ফিরে গিয়ে তিনি করবেনটা কী? মেয়ের কাছে ইতালিতে গিয়ে বাকী জীবনটা কাটানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, সেও রাজী হবে বলে মনে হয় না। বম্বেতেই বা তিনি একা থাকবেন কী করে?

“কী হল, কিছু বললে না যে?” অরুণোদয় জিজ্ঞ্যেস করলেন।

মৈত্রেয়ী চুপ করেই রইলেন। এর কোনো উত্তর তাঁর কাছে নেই। যে মানুষটা কোনোদিনই তাঁর ছিল না, এখন তাকে ছেড়ে দেওয়ার কী অধিকার তাঁর আছে? এখন তিনি নতুন করে রিক্ত, নিঃস্ব। তাঁর কেউ নেই – বাবা মা নেই, স্বামী সন্তান থেকেও নেই, প্রাক্তন প্রেমিক – সেও তো আর তাঁর নেই। তিনি একজন ছাপ্পান্ন-বর্ষীয়া সম্পন্না প্রবাসী গৃহিণী এবং মা, কিন্তু আজ তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে একলা মানুষ। যার কেউ নেই, সে কী করে একা বাঁচে তিনি জানেন না। এই বয়সে এসে কী করে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয় সেটাও তিনি জানেন না। তবে এবার জানবেন, হয়ত।

——————-

এই গল্পটি নর্থ অ্যামেরিকা সার্বজনীন কালীপুজো অ্যাসোসিয়েশনের ২০১৩ স্যুভেনিরে প্রকাশিত।

Advertisements
 
3 Comments

Posted by on December 18, 2013 in গল্প

 

Tags: , , , , , , ,

3 responses to “বেঁচে থাকা আর অভিনয়

  1. Nilanjana Bose

    December 18, 2013 at 12:25 PM

    Beautifully written, evocative.

     
    • pridreamcatcher

      December 19, 2013 at 12:11 PM

      Thank you so much Nilanjana. coincidentally, read your story Min Zamaan today and loved it 🙂

       
  2. Arijit Banerjee

    December 19, 2013 at 10:57 AM

    Bhalo laglo 🙂 Khub touchy

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: