RSS

“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা…”

25 Sep

আমার মত আরো অনেকে যারা আশির শেষনব্বইয়ের দশকে কৈশোর পার করে এসে নতুন শতকের আশেপাশে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, তারা এই লেখার সঙ্গে বেশি করে একাত্মবোধ করবে। গত দুই দশকে চলতি বাংলা ভাষায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে যেটাকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। শুধু আমার প্রজন্ম নয়, আগের প্রজন্মও এগুলো শুনতে শুনতে বেশ প্রভাবিত হয়েছেন। শব্দ/বাক্যবন্ধগুলি শুনতে মোটেও খুব শ্রুতিমধুর নয়, তবে আমাদের এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে ওগুলিকে এখন আর আলাদা বলে মনে হয় না, কথার মাত্রা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাইস্কুলে বা কলেজের প্রথমদিকে এইসব শব্দ/বাক্য বাড়িতে বললে সবাই কেমন অবাক হয়ে যেত। এখন ব্যাপারটা বেশ পালটে গেছে, মাবাবাও অবলীলায় এর মধ্যে কিছু কিছু ব্যবহার করছেন দৈনিক জীবনে। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবেঃ

১। চাপ – দুই প্রকারের হয়, এক হল চাপ আছে/নেইআর দ্বিতীয় হল চাপ নেওয়া। এটা প্রথম শুনি বোধহয় কলকাতা এসে। তার আগে অব্দি আমাদের মফস্বল অঞ্চলে চাপ‘-এর প্রচলন হয়নি। মুশকিল/ঝামে্লা/অসুবিধা এগুলো বেশ চলত। টেন পাস করে কলকাতা এসে শুনলাম লোকে বলছে, “চাপ হয়ে গেল, বুঝলি,” এবং তার চেয়েও বেশি যুগান্তকারী, “চাপ নিস না।” চাপের সঙ্গে সেই যে আমার পথচলা শুরু হল, আজও নিরবিচ্ছিন্ন আমাদের যোগাযোগ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন বিদেশে পড়তে গেলাম, ফোনে কথা বলতে বলতে গোটা পরিবারের লোককে চাপের ব্যবহার শিখিয়ে দিয়েছিলাম। যার ফলে মাবাবাও এখন দূর থেকে ফোনে সুন্দর করে বলেন, “চাপ নিস না যেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

২। একঘর – এটা প্রথম শুনেছিলাম পিসতুতো ভাইয়ের কাছে। শুনে ভেবেছিলাম ওদের বেহালার কোনো উন্নত ভাষা যেটা আমি মফস্বলে থাকি বলে জানিনা। মোটামুটি ক্লাস এইটনাইন নাগাদ একবার পুজোয় দেশের বাড়িতে গিয়ে কী একটা দারুণ রান্না খেয়ে বলল, “আহ, একঘর হয়েছে!” বলাই বাহুল্য, কেউ বোঝেনি। সবাই ওর এই বিশেষণে হুব্বা হয়ে তাকিয়ে ছিল। হুব্বাকী, সেটা পরে বোঝাচ্ছি। একঘর মানে যে দারুণ/ব্যাপক, সেটা তখন জানলাম। তবে আমি এখন আর একঘরের বিশেষ ব্যবহার করি না, কেন কে জানে!

৩। ব্যাপক – বোধহয় প্রথম শুনি আমার কাকার কাছে। আবারও, শুনে ভেবেছিলাম কলকাত্তাইয়া ভাষা, আমি মফস্বলী কোথা থেকে জানব! ব্যাপক মানেও দারুণ, তবে ঠিক কতটা দারুণ সেটা বোঝাতে পারব না। যাঁরা কথায় কথায় আমার মত ব্যাপক বলেন, তাঁরা বুঝবেন। খাবার থেকে পোষাক থেকে সিনেমা, সবই ব্যাপক হতে পারে।

৪। হুব্বা গার্লস কলেজে পড়েছি বলে হুব্বাটা শুনতে একটু দেরি হয়ে গেছিল। কলেজে পড়াকালীন খবরের কাগজে হুব্বা শ্যামল বলে মাফিয়ার কথা পড়েও বিশেষণটা আদৌ বুঝিনি। ইউনিভার্সিটি গিয়ে চ্যাংড়া ছেলেপিলের পাল্লায় পড়ে বুঝলাম হুব্বা মানে হল অবাকঅবাকতরঅবাকতম একটা ব্যাপার। মানে ভাষায় বোঝানো যায়না এরকম একটা এক্সপ্রেশন। এ বিষয়ে সবচেয়ে মজার গল্পটা শুনেছিলাম আমার বেটার হাফের কাছে, ওদের কলেজে এক সহপাঠীর ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল হুব্বা, কারণটা এখনও কেউ জানে না।

৫। ক্যালানো দুই প্রকারের হয়, একের মানে কাউকে বেদম পেটানো(ক্যাল দেওয়া), দুই হল দাঁত ক্যালানো, অর্থাৎ দন্তবিকশিত করা। বিদ্বজনেরা হয়ত এটাকে গালাগালি বলবেন, কিন্তু আজকাল কাগজসিনেমার দৌলতে পিসেমশাই থেকে রাঙামামা সবাই ক্যালাচ্ছেন (মোস্টলি দাঁত)

৬। যা তা সাধারণত যা তামানে বাজে/বেকার/জঘন্য ছিল চিরকাল। আমাদের সময়ে এসে মানেটা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হয়ে গেল, এখন যা তামানে ভাল/দারুণ। কে বা কারা কেন যে এটা উলটে পালটে দিয়েছিল আজও জানিনা। তবে আমাদের কাছে এখন যা তাহল ব্যাপকের সমার্থক শব্দ। শুধু গত দুই প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলার সময় মাথায় রেখে সুরটা যা তা তো!'(দারুণ) থেকে বদলে যা তা!'(জঘন্য) করে যেতে হয়।

৭। কেতকেতার মত দুই অক্ষরের ছোট্ট শব্দকে যে আরো ছোট করা যায়, সেটা আমি একটু বয়সে জেনেছিলাম। কেউ সাধারণ কোনো উপলক্ষে বিশাল সেজেগুজে এলে তাকে আওয়াজ দেওয়া হয় ওরে না, কী কেত!’ বলে। সঠিক কেতায় আসলে তাকে কেউ কেত মারা বলে না, এর ব্যবহার একটু ব্যাঙ্গাত্মক।

৮। অঞ্চল – এর আমদানী বোধহয় মফস্বলে, কেননা কলকাতায় কারুর মুখে অঞ্চলবিশেষণ হিসেবে শুনিনি। ব্যবহারে সেই ব্যাপক/দারুণের সমার্থক, তবে এটি একটু বিশেষ ধরণের বিশেষণ। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, ‘অঞ্চল চাপ চলছে,’ বা অঞ্চল মেয়ে,’ বা অঞ্চল পরীক্ষা হয়েছে।এর একটি সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন ঘ্যামা। প্রথমবার শুনে প্রায় সবাই ঘ্যামআর ঘামে গুলিয়ে ফেলেন।

৯। চাট – পাপড়ি/ছোলার/আলুর/বাংলার নয়, এ চাট আরো সাঙ্ঘাতিক। একটু খেলেই পেট ভরে যাবে এবং এটা অধিকাংশ লোকেই খেতে চান না। চাট দেওয়াবা কাউকে চাটামানে কোনো বিষয়ে তাকে কথায় নাস্তানাবুদ করা। যে চাট দেয় সে বলে চাটলামআর যে চাট খায়, তাকে বাধ্য হয়ে বলতে হয়, ‘চেটে গেলাম, মাইরি!’ দ্বিতীয়টার অবশ্য আরো ব্যপ্তি আছে। শুধু ব্যক্তিবিশেষ নয়, আবহাওয়া, ট্র্যাফিক জ্যাম, অফিসের বস, বাস/ট্রেনের ভীড়, সবকিছুই আপনাকে চেটে দিতে পারে। মেজাজ খারাপ থাকলেও অনেকে ফোনে ছোট করে সারেন, ‘চেটে আছি, পরে কথা হবে।আজকাল পশ্চিমবঙ্গের রাস্তায় বেরোলে এই ধরণের কথা আপনি শুনতে বাধ্য। মিলিয়ে নেবেন পরের বার।

১০। আরবিট – বুঝলেন না তো? arbitraryর ল্যাজ ছেঁটে ফেলুন, পেয়ে যাবেন। তবে ইংরিজির থেকে বাংলায় আরবিটের ব্যবহার অনেক বেশি। হঠাত থেকে বোকাবোকা থেকে অযৌক্তিক, অনেকরকমভাবেই আমরা আরবিট বলে থাকি। সমমনস্ক লোকজন বুঝেও নেয়, এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি।

১১। বাওয়াল – ওই যাকে বলে, লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট! সোজা কথায় বোঝানো যাবে না, বাওয়াল মানে ঝামেলা/ঝগড়া, ক্ষেত্রবিশেষে বিপদও। বাওয়াল দেওয়াবা বাওয়ালি করাএখন বাঙালি বাড়িতে নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে। ফোনে মায়ের গলাটা একটু কেমন কেমন লাগলে জিজ্ঞ্যেস করে ফেলি, “কী হল, কোনো বাওয়াল হয়েছে?” এই বাওয়ালটা কাজের মাসি থেকে ভাড়াটে থেকে ছোটপিসি, যে কারুর সাথেই হয়ে থাকতে পারে। বাওয়াল মানে কোনো সাধারণ ঝগড়াবিবাদ নয়, বাওয়াল একটা যাকে বলে ফেনোমেনন। বন্ধুবান্ধবী, স্বামীস্ত্রী, শাশুড়িবৌমা, বসআপনি, ভাড়াটেবাড়িওয়ালা, কন্ডাক্টরঅটোচালক, ভারতপাকিস্তান, সৌরভগ্রেগ, সবার মধ্যেই বাওয়ালি হয়েছে, হয়ে থাকে। কালে কালে হয়ত আমার দৈনন্দিন বাওয়াল বদলে নতুন কোনো শব্দ নিয়ে আসবে পরের প্রজন্ম।

পুনশ্চ – বাংলায় খিস্তির বিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার বাসনা ছিল। তবে মহিলা ব্লগার হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে বসে সেই নিয়ে লিখলে ব্যানফ্যান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সুধী পাঠকগণ, যদি কোনোদিন ভারতপাকিস্তানবাংলাদেশআফগানিস্তানের বাইরে বেরোতে পারি, তখন নাহয়

Advertisements
 
6 Comments

Posted by on September 25, 2013 in প্রবন্ধ

 

Tags: , , , , , , , , , , , , ,

6 responses to ““ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা…”

  1. Arijit Banerjee

    September 26, 2013 at 9:50 AM

    Awesome……guru ghyama hoyechhe 🙂 😀

     
  2. arandomstateofmind

    September 27, 2013 at 9:39 PM

    চম্পা লিখেছিস মাইরি !!..:-D..

     
    • pridreamcatcher

      October 1, 2013 at 12:05 AM

      ‘চম্পা’টা মিস করে গেছি 😀

       
  3. Abhra Pal

    September 30, 2013 at 11:55 PM

    ব্যাপক লিখেছিস। আমার তো ইচ্ছে করছে লিস্টটা আরও একটু বাড়াতে।

     
  4. জয়ন্ত

    December 3, 2013 at 10:55 PM

    পাগলা ক্ষীর খা

     
  5. স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

    April 10, 2014 at 9:41 AM

    ঝম্পু হয়েছে। পুরো মাখন!

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: