RSS

বিগ বস বাংলা সিজন ১

19 Sep

বিগ বস বাংলা অনুষ্ঠানটি শেষ হয়ে গেছে গত সপ্তাহে। পাঠকদের মধ্যে কতজন দেখেছিলেন, কতজন শুধু খবরের কাগজে চাটনিটুকু চেটেপুটে খেয়েছিলেন আর কতজন আদৌ এই বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না, তা আমি জানিনা। পুরো অনুষ্ঠানটির সারসংক্ষেপ এখানে আমি দিতে আসিনি, যাঁদের দরকার তাঁরা গুগলবাবার শরণ নেবেন। আমি শুধু এতদিনের কারবার দেখে নিজের অনুভূতিগুলো এখানে ব্যক্ত করতে এলাম। বিগ বস শুরু হয়েছিল জুন মাসে, মূল প্রতিযোগী ছিলেন তেরোজন। পাঠকদের সুবিধার্থে একবার তাঁদের নাম পরিচয় দিয়ে দি রুদ্রনীল ঘোষ(অভিনেতা), অনীক ধর(গায়ক), পটা(গায়ক), সুদীপ্তা চক্রবর্তী(অভিনেত্রী), মল্লিকা মজুমদার(অভিনেত্রী), কনীনিকা ব্যানার্জী(অভিনেত্রী), ক্যায়স কলিম(মডেল/অভিনেতা!), মহেশ জালান(জ্যোতিষী), মানবী বন্দোপাধ্যায়(প্রফেসর, কবি), নন্দিনী পাল(টিভিতে রান্না শেখান), বিক্রম চ্যাটার্জী(অভিনেতা), আইরিস মাইতি(মডেল), সম্পূর্ণা লাহিড়ী(অভিনেত্রী); ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রিঃ কার্লিতা মোহিনী(ইন্দো ল্যাটিন গায়িকা!), কার্তিক দাস(বাউল)

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

সত্যি বলতে কী, হিন্দি বিগ বসের গত ছটি সিজনে একটিও গোটা পর্ব দেখে উঠতে পারিনি। ঠিক পোষায়নি। উত্তর ভারতীয় গালাগালি/মারামারি এবং টিভি সিরিয়ালের অচেনা অভিনেতাদের কার্যকলাপ দেখার কোনো উৎসাহ বোধ করিনি। বাংলায় বিগ বস হবে শুনেও নাক সিঁটকেছিলাম, কী আর হাতি ঘোড়া হবে। উৎসাহের অভাবে প্রথম মাসখানেক দেখিনি। বাড়ির লোকেরা মাঝে মাঝে ফোনে আপডেট দিতেন। এক রবিবার দুপুরে টিভিতে ভাল সিনেমার আয়েসের অভাবে চ্যানেল সার্ফ করতে করতে বিগ বসে গিয়ে ঠেকলাম। পর্দায় তখন রুদ্রনীলকে দেখাচ্ছিল। আমার বেটার হাফ আবার রুদ্রর অভিনয়ের বেশ ভক্ত, ইন ফ্যাক্ট আমিও। তার কদিন আগেই সাক্ষ্য করেছি যে একটি বেশ বাজে সিনেমাকে রুদ্র একা কী করে টেনে গেছেন (সে বিষয়ে আবার কখনো লিখবখন)। কী ভেবে পর্বটি দেখতে বসে গেলাম।

শোয়ের নিয়ম মেনে স্বাভাবিকভাবেই কূটকচালিঝগড়াঝাঁটি চলছিল। বেশ কয়েকজন ততদিনে বেরিয়ে গেছেন এবং ওয়াইল্ড কার্ডে ঢুকেছেন কার্লিতা মোহিনী। বাপ রে বাপ, সে কী ঝগড়া মশাই। টিভির ভল্যুম মিনিমাম করেও শান্তি নেই। দুচারজন ছাড়া বাকী সবাই বাংলা বিনোদন জগতের চেনা মুখ বলে এরপর থেকে অনুষ্ঠানটি নিয়মিত দেখতে বসেও গেলাম। সপ্তাহান্তের এভিকশনে মোটামুটি টেনশনও হত যে কে বেরিয়ে যাবে আর কে থাকবে। সুদীপ্তা আর মল্লিকার পুনরাগমনে বেশ ভাল লেগেছিল, ওঁরা থাকাতে বিগ বসের ইন্টারেস্ট কোশেন্ট বেড়েছে বই কমেনি আমার ধারণা। তবে মল্লিকার কান্না, কার্লিতার উগ্রতা, সুদীপ্তার ইমোশন, বিক্রমআইরিসের খুনসুটি, অনীকের গদাইপনা, এসব ছাপিয়ে যিনি আমাকে প্রভাবিত করেছেন তিনি রুদ্রনীল।

রুদ্রনীলের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে বোধহয় কারুর কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু ওঁর স্থিতধী স্বভাবের পরিচয় পাওয়া গেল বিগ বসের বাড়িতে। বাকীদের কানফাটানো ঝগড়ার মধ্যেও নিজের মাথা ঠান্ডা রেখে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে রুদ্রনীল বেশ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ প্রতিযোগী থেকে দর্শক অনেক সময়ই ওঁকে হৃদয়হীন‘, ‘ডিপ্লোম্যাটিক‘, ‘ম্যানিপ্যুলেটিভ‘, ইত্যাদি বিশেষণে অভিযুক্ত করেছেন। সুদীপ্তা পুনরাবির্ভাবের পরের পর্বেই ওঁর পেছনে তুলোধোনা করে আর কাগজে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়ে দর্শকদের সিমপ্যাথি কুড়িয়েছেন। কিন্তু একটু ভাল

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

করে খেয়াল করলে সুদীপ্তার চোখে দ্বিধাগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পেতেন। ভোট আর সুহানুভূতির জন্যে গালাগাল করে পুরনো বন্ধু হারানোর দুঃখটা আমি ওঁর চোখে ধরতে পারছিলাম। অন্যদিকে পেছনে একটু পিএনপিসি ছাড়া রুদ্রনীল কিন্তু কারুর সামনে বা পেছনে গালাগাল না করে নিজের জায়গাটা ভাল বজায় রেখেছিলেন। যে সুদীপ্তা আর কনীনিকা ওঁর চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলেন, টাস্কের সময় কিন্তু নাটকগানঅভিনয়ের জন্যে তাঁরাই রুদ্রনীলের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছেন। যদি কেউ রুদ্রনীলসুদীপ্তা অভিনীত ছোট নাটিকাটি দেখে থাকেন এই অনুষ্ঠানে, তাহলে নিশ্চয়ই বুঝবেন আমি কী বলতে চাইছি। অত কম সময়ে একটি অসাধারণ চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখে, সুদীপ্তাকে দিয়ে এবং নিজে অসামান্য অভিনয় করে রুদ্রনীলের প্রতিভার একটুখানি অংশ মাত্র প্রতিফলিত হয়েছে। যাঁরা ওই নাটিকাটি দেখেননি, বিশ্বাস করুন, খুব মিস করেছেন। সংলাপ এবং অভিনয়ে আমার মত লোকেরও চোখে জল এসে গিয়েছিল। কেউ যদি জিজ্ঞ্যেস করেন, মাস দেড়েক ধরে এই কূটকচালি দেখে আমার সবচেয়ে প্রাপ্তি ওই নাটিকাটি দেখা।

একটু আগে রুদ্রনীল সম্পর্কে যে বিশেষণগুলো দিলাম, সাধারণ দর্শক(যার মধ্যে আমার মাশাশুড়িও পড়েন) সেগুলোর সঙ্গে আরেকটা কথা যোগ করেছেন, “বাবা, রুদ্র তো কীইইইইইইই পলিটিক্স করে গেল!” বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় পলিটিক্সব্যাপারটা এমন ঢুকে গেছে যে সংসদ অভিধানে শব্দটা অবিলম্বে যোগ করা উচিত। আত্মীয়স্বজন থেকে দোকানদার, কাজের মাসি থেকে অফিসের পিওন, বৌমা থেকে সেজমামী বাঙালির ভাষায় সবাই পলিটিক্স করে।আদতে ব্যাপারটা রাজনীতির থেকেও ঘোরালো। তাই রুদ্রনীলের গেম প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজি, ঠান্ডা মাথা, নির্লিপ্ত স্বভাব, সবই হয়ে যায় পলিটিক্স। আর সেখানে অনীকের রোমিওপনা, মল্লিকার অহেতুক কান্নাকাটি বা কনীনিকার একাকীত্বদর্শকদের অনেক বেশি কাছে টানে। রুদ্রনীলের নির্লিপ্ততা যে পৃথিবীর সামনে ওরঁ একটা ঢাল, সেটা কিছু মুহুর্তে খুব ভাল বোঝা গেছে। কার্তিক দাস বাউলের সঙ্গ পেয়ে রুদ্রনীল মাঝে মাঝে নিজেকে খুলে ধরেছেন, নিঃশব্দে কেঁদেছেন, ঝগড়া বা বিবাদ থেকে আরো দূরে সরে গেছেন, এবং বেশ কিছু মুহুর্তে সেনসিটিভ প্রতিদ্বন্দ্বীদের (সুদীপ্তা, কনীনিকা, মল্লিকা) পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সাহায্য করেছেন। এগুলোও পলিটিক্সের অঙ্গ হতে পারে, কিন্তু দর্শক হিসেবে রুদ্রনীলের কাছ থেকে এগুলো আমার প্রাপ্তি।

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

ছবি সৌজন্যেঃ গুগল

গোটা পনেরো বছরের কর্মজীবনে ভদ্রলোক অনেকবার খবরে এসেছেন, অনেক বিতর্কে জড়িয়েছেন, নারীঘটিত কারণে অনেকের বিরূপতা পেয়েছেন। কলকাতায় ফিরে এসে হয়ত উনি বেশ কয়েকজন বন্ধু হারাবেন, হতে পারে বেশ কিছু কাজও হারাবেন। বিগ বসে তিনমাস ধরে যদি উনি শুধু অভিনয় করে থাকেন, তাহলে এরকম অসামান্য অভিনয়ের জন্যে ওঁর পুরস্কার পাওয়া উচিত। আর যদি পুরোটা অভিনয় না করে থাকেন, তাহলে বেশ কিছু মুহুর্তে সংবেদনশীলতা দেখানোর জন্যে আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল ওঁর প্রতি। বস, চব্বিশ ঘন্টা প্রতি মুহুর্তে তুখোড় অভিনয় রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই, আমার কাছে বিগ বস বাংলা সিজন ১এর বিজয়ী অনীক ধর ননরুদ্রনীল ঘোষ।

(বিগ বস থেকে বেরিয়ে এসে রুদ্রনীলের প্রথম সাক্ষাৎকার পড়ুন এখানে)

Advertisements
 
4 Comments

Posted by on September 19, 2013 in টেলিভিশন, রচনা

 

Tags: , , , , , , , , , , , , , , ,

4 responses to “বিগ বস বাংলা সিজন ১

  1. Abhra Pal

    September 20, 2013 at 7:33 AM

    যত পড়ছি তোর লেখার আরও বেশি করে ফ্যান হয়ে যাচ্ছি।

     
    • pridreamcatcher

      September 20, 2013 at 12:20 PM

      এটা কি বার খাওয়ানো হল নাকি গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া? 😛

       
      • Abhra Pal

        September 21, 2013 at 12:40 AM

        যাচ্চলে – গাছেই বা তুললাম কখন আর মই ই বা কাড়লাম কখন?

         
  2. স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

    April 10, 2014 at 9:29 AM

    কায়েস কলিম-কে কিন্তু ফাটাফাটি দেখতে; ও বাংলা ‘স্বয়ম্বর’-এও ছিল।

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: