RSS

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

10 Apr
সত্য ঘটনা অবলম্বনে

দৃশ্য একঃ

সন্ধ্যাবেলা। একটি ঘরে টেবিলে বইখাতা রেখে একটি মেয়ে পড়ছে। পাশে রাখা মোবাইল ফোনটি ভাইব্রেট করল (সাইলেন্ট মোডে রাখা)। 

মেয়েটি চেনা নম্বর দেখে ফোনটা ধরল। 

মেয়েটিঃ  হ্যাঁ, বলো।

(অপর প্রান্তে)একটি ছেলের উত্তেজিত কন্ঠঃ  এই জানিস, কালকে কী হয়েছে?

মেয়েটিঃ  কী?

ছেলেটিঃ  আমার সেই বন্ধু আছে না, যে গত বছর বিয়ে করল? ওদের একটা মেয়ে হয়েছে দুদিন আগে। আমি কালকে হাসপাতালে দেখতে গেছিলাম। কী মিষ্টি হয়েছে রে বাচ্চাটা!

মেয়েটিঃ  তাই? বাহ, দারুণ তো।

ছেলেটিঃ  আসল মজাটা কী হয়েছে শোন না! ওখানে বন্ধুর এক কাকা এসেছিলেন, তিনি বাংলা সিনেমার একজন পরিচালক। আমাকে দেখে হঠাৎ বললেন, “তোমার চেহারা, কণ্ঠস্বর অতি চমৎকার। আমি চাই তুমি আমার একটি ফিল্মে অভিনয় করো। এই আমার কার্ড, কালকে আমার অফিসে চলে এসো একটা ফোন করে।” ভাব কী কেলো!

মেয়েটি(হেসে): তা ভালই তো, যাও না। একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো।

ছেলেটি(রাগত): তুই কি খেপলি? ফিজিক্সএ এমএসসি করে আমি বাংলা ফিলিমে ওই গাছের পেছনে নায়িকার কোমর ধরে নাচব?

মেয়েটিঃ  হ্যাঁ, সেটাও করতে পারো। মন্দ লাগবে না। আমরাও একটু বড় পর্দায় তোমার সার্কাস দেখতে পাব। (হাসি)

ছেলেটিঃ  বাজে বকিস না তো! তুই এখন কোথায়, ল্যাব?

মেয়েটিঃ  আরে না, আজকে তো ছুটি। গুরু নানকের জন্মদিন না? ল্যাব যাইনি, বাড়িতেই।

ছেলেটিঃ  ও আচ্ছা। আমি এখন রাখি, বুঝলি? রাতে এসএমএস করব, ঠিক আছে?

মেয়েটিঃ  ঠিক আছে, কোরো। বাই।



দৃশ্য দুইঃ (দিন পনেরো বাদে)

কলকাতার কোনো একটি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ল্যাব। আমাদের পূর্বপরিচিত মেয়েটি একমনে কাজ করছে। এই সময়ে ডেস্কে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। মেয়েটি অচেনা নম্বর দেখে হাতের জিনিসপত্র রেখে সিঙ্কে হাত ধুতে গেল। একটা কলএর তেরোটা রিং পুরো হবার আগেই সে হাত ধুয়েমুছে এসে ফোনটা হাতে নিল। তারপর ল্যাব থেকে বেরিয়ে করিডরের শেষ প্রান্তে গিয়ে জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়াল।

মেয়েটিঃ  হ্যালো?

অপর প্রান্তে সেই ছেলেটিঃ  কেমন আছিস?

মেয়েটিঃ  ওহ, তুমি! বলো।

ছেলেটিঃ  কেমন আছিস?

মেয়েটিঃ  কী মনে হয় তোমার? কেমন থাকতে পারি?

ছেলেটিঃ  মনে তো হচ্ছে ভালই আছিস।

মেয়েটি(হেসে): তা হলে তাই, ভালই আছি। হঠাৎ আমাকে ফোন করলে যে?

ছেলেটিঃ  তোর সাথে একটা জরুরি কথা বলার ছিল। আমার থেকে তুই ঠিক কী চাস বল তো?

মেয়েটিঃ  কী চাই মানে? সবই তো জানো।

ছেলেটিঃ  হ্যাঁ জানি। কিন্তু আমি একবার তোর কাছ থেকে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে নিতে চাই।

মেয়েটিঃ  কী মুশকিল! নতুন করে আবার কী বলব, তাও আবার এভাবে? জানোই তো ফোনে আমার ঠিক কথা আসেনা।

ছেলেটিঃ  না, ফোনেই বলতে হবে। যা বলছি কর। চোখটা বন্ধ করে একটা লম্বা নিশ্বাস নে, তারপর ছেড়ে দিয়ে, যা বলার বল।

ছেলেটি যা যা নির্দেশ দিল, মেয়েটি সব করল পর পর। তারপরেও ফোনটা ধরে মিনিট খানেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

মেয়েটি(হতাশ): ধুর, আমি এভাবে বলতে পারছি না। তুমি জিজ্ঞ্যেস করো ঠিক কী জানতে চাও।

ছেলেটিঃ  ঠিক আছে, জিজ্ঞ্যেস করছি। তুই বলেছিস যে তুই আমাকে ভালবাসিস, ঠিক?

মেয়েটিঃ  হ্যাঁ।

ছেলেটিঃ  আমাকে বিয়ে করতে চাস?

মেয়েটি(মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে): হ্যাঁ, চাই।

ছেলেটিঃ  কতটুকু জানিস তুই আমাকে? আমি কলেজে তোর সিনিয়ার ছিলাম, কিন্তু অন্য ডিপার্টমেন্টে। তখন কোনোদিন কথা হয়নি। কদিন আগে হঠাৎ বললি যে তুই আমাকে ভালবাসিস। জানিস আমার কী কুখ্যাতি কলেজে? লোকে বলে আমি যে মেয়ের দিকে দৃষ্টি দিই, তার সর্বনাশ করে ছাড়ি। এসব শুনেও তুই আমাকে ভালবাসলি কী করে? পাগল নাকি তুই?

মেয়েটিঃ  হ্যাঁ, আমি পাগল। দেখো, লোকের কথায় আমি বিশ্বাস করি না। তোমাকে আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে বুঝেছি তুমি ওরকম কিছু নও। যত্তসব!

ছেলেটিঃ  শোন, আমার লাইফস্টাইল হয়ত তুই জানিস না। বাপের পয়সা আছে প্রচুর, সেই সূত্রে আমাকে যে সার্কলে মিশতে হয় সেখানে প্রত্যেক উইকেন্ডে ডিস্ক যেতে হয়, দামী দামী মদ খেতে হয়, আর হাজারটা অসহ্য মেয়েকে কম্প্যানি দিতে হয়। তুই আমার এই ইর‌্যাটিক জীবনের সাথে মানিয়ে নিতে পারবি না।

মেয়েটিঃ  উফ, আমি জানি আমি পারব। তুমি একটা সুযোগ তো দিয়ে দেখো।

ছেলেটিঃ  বাই দ্য ওয়ে, এত যে লাফাচ্ছিস, তোর বাড়িতে কি আমাকে মেনে নেবে?

মেয়েটিঃ তাদেরকে কনভিন্স করানোর একটা চান্স তো তুমি দেবে দয়া করে?

ছেলেটিঃ  তার মানেই মানবেন না। দেখ, আমি ধর্মটর্ম মানি না। আমার আর তোর ধর্ম যে একেবারেই আলাদা, তাতে আমার কিছু এসে যায় না।

মেয়েটিঃ  আমারও যায় না। গেলে কি আর তোমাকে অকপটে ভালবাসতে পারতাম?

ছেলেটিঃ  কিন্তু তোর ফ্যামিলির তো আপত্তি হবে? আর তোর জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট লোকগুলোকে দুঃখ দিয়ে আমি তোর সাথে কোনো সম্পর্ক গড়তে পারব না।

মেয়েটিঃ  তুমি আগে থেকেই এত কিছু ধরে নিচ্ছ কেন? একবার চেষ্টা তো করতে দাও আমাকে।

ছেলেটিঃ  না, তুই ভুল করছিস। একটু প্র্যাক্টিকালি ভাব। এরকম অবুঝের মত আবেগে ভেসে যাওয়ার থেকে তো বেশী বয়স হয়েছে আমাদের, নাকি? তুই পারবি না। ভুল লোক বা ভুল কারণের জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না। তোর সামনে এখন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। নেটটা কবে?

মেয়েটিঃ  আঠাশ তারিখে, আর দশ দিন মাত্র বাকি। চাপ খেয়ে যাচ্ছি একটু ওটা নিয়ে। যা সিলেবাস!

ছেলেটিঃ  চাপ নিস না। ভাল করে প্রিপারেশন নিয়েছিস তো, ভালই হবে দেখিস।

মেয়েটিঃ  তুমি যখন বলছ, ভালই হবে নিশ্চয়ই। জানো তো, তুমি আমার লাকি চার্ম। কলেজের পরীক্ষায় যেদিন যেদিন তোমাকে দেখেছি, ব্যাপক পরীক্ষা হয়েছে। (হাসে অল্প)

ছেলেটি(অট্টহাসি দিয়ে): আমি লাকি চার্ম! বলিস কী রে! যা তা দিলি তো এটা। এবারও ভাল হবে দেখিস। বেস্ট অফ লাক। আমাকে জানাস কেমন হল।

মেয়েটিঃ  হ্যাঁ, তোমাকেই সবার আগে জানাব অবভিয়াসলি।

ছেলেটিঃ  ঠিক আছে, এখন আমি রাখলাম। বাই।

মেয়েটিঃ  বাই।

দৃশ্য তিনঃ (দিন দশ বাদে)

বিকেল পাঁচটা। শহরের কোনো একটি স্কুলের সামনে বাস স্টপে মেয়েটি দাঁড়িয়ে, মোবাইল ফোন ডায়ালরত।

অপরপ্রান্তে সেই ছেলেটিঃ  বল, কেমন হল?

মেয়েটিঃ  খুব একটা মন্দ না। সেকেন্ড পেপারটা তো ভালই নামিয়েছি।

ছেলেটিঃ  গুড। ওটাই তো বেশী শক্ত হয়।

মেয়েটিঃ  কিন্তু ফার্স্ট পেপারটা মনে হয় পুরো ছড়িয়ে এলাম।

ছেলেটিঃ  অত ভাবিস না। দেখা যাক, হয়ে যাবে ঠিক।

মেয়েটিঃ  আর না হলে আবার দিতে হবে। দূর।

ছেলেটিঃ  আরে বলছি না ধৈর্য্য রাখ একটু। উফ!

মেয়েটিঃ  আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। অত রাগ কোরো না তো। ভাল্লাগে না।

ছেলেটিঃ  শোন, তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে।

মেয়েটিঃ  কী গো?

ছেলেটিঃ  আমি গত সপ্তাহে আইআইটি মুম্বাইতে ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম। ওরা সিলেক্ট করেছে পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য। জয়েন করেই নেব ভাবছি।

মেয়েটিঃ  বাহ, এ তো খুব ভাল খবর। কনগ্র্যাটস! কবে জয়েনিং?

ছেলেটিঃ  পনেরো তারিখের মধ্যে পৌঁছাতে হবে।

মেয়েটিঃ  হুঁ।

ছেলেটিঃ  তোকে যেটা বলার ছিল, এগুলো এবার বন্ধ কর। আমাকে ফোন করিস না আর, মেলও না, এসএমএসও না, আমিও করব না। জীবনটা ফ্রেশলি শুরু কর।

মেয়েটিঃ  মেলটুকুও করতে দেবে না?

ছেলেটিঃ  না। যেটার কোনো ভবিষ্যত হবে না, সেটার বর্তমান রেখেও তো লাভ নেই। এভাবে হয় না।

মেয়েটিঃ  একেবারে যোগাযোগ শেষ করে দেবে আমার সাথে?

ছেলেটিঃ  হ্যাঁ। সেটাই তোর, আমার, সবার জন্য ভাল হবে।

মেয়েটি (চুপ)

ছেলেটিঃ  এটাই আমাদের শেষবারের মত কথা। ভাল হয়ে থাকিস।

মেয়েটি (চুপ)

ছেলেটিঃ  ভাল থাকিস। রাখলাম, বাই।

মেয়েটি (চুপ) (অস্ফুটে “বাই” বলল। আর তার চোখ দিয়ে বিন্দু বিন্দু কান্না রক্ত হয়ে ঝরতে লাগল।)

 উপসংহারঃ

ছেলেটি এখনো আইআইটি মুম্বাইতে, তবে শোনা যাচ্ছে সে নাকি পিএইচডি ছেড়ে দিয়ে শিগগিরই চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে যাবে। নির্বাসনে।

আর মেয়েটি নেট পরীক্ষায় পাস করেনি এবার। আবার দেবে হয়ত। এখন সে একটি সাধারণ চাকরি করছে। তবে তার একটা অদ্ভূত রোগ হয়েছে। সারাদিনে বহুবার ইমেল চেক করে, আর রাত্রিবেলা যতবার ঘুম ভেঙে যায়, মোবাইল ফোনটার দিকে তাকায়, একটা এসএমএসএর আশায়… 

Advertisements
 
3 Comments

Posted by on April 10, 2013 in নাটিকা

 

Tags: ,

3 responses to “সত্য ঘটনা অবলম্বনে

  1. rajrupa12

    May 9, 2013 at 10:04 PM

    Bah!

     
  2. স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

    April 10, 2014 at 9:34 AM

    ব্যথা উথলে উঠল।

     
  3. Neha Banerjee

    September 23, 2016 at 6:32 PM

    Superb..kono kotha hbe na

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: