RSS

আহির ভৈরোঁর টানে

22 Mar

shiuli

ভোর ব্যাপারটা চিরকালই আমার কাছে খুব elusive ছিল, মানে ছলনাময়ী টাইপের একটা জিনিস।আদৌ আছে কি নেই সেটা খুব ভাল বুঝতাম না এক সময়ে। একদম ছোটবেলায় খুব ঘুমকাতুরে ছিলাম। ভাগ্যি ভাল যে মর্নিং স্কুল ছিল না, ধীরেসুস্থে বেলায় যেতাম। তখন ভোর বলতে মহালয়া আর বছরে যে কদিন দিদার বাড়িতে থাকতাম। মহালয়ার দিন সত্যিই ভোরে উঠে পড়তাম, পাঁচটা নাগাদ রেডিওর আওয়াজে ঘুম ভাঙত। চোখমুখ ধুয়েই বাগানে গিয়ে শিশিরমাখা শিউলি কুড়োতাম। অন্যদিন হয়ত পুজো করার আগে মা কিছুটা শিউলি কুড়োত আরো নানাবিধ ফুলের সাথে, কিন্তু মহালয়ার ভোরটা আমার জন্য তুলে রাখা থাকত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলার আওয়াজের সামনে বোধহয় চুবড়িতে করে একরাশ শিউলি রাখার দস্তুর থাকা উচিত। তাতে বেশ একটা আলাদা আমেজ আসে, অন্তত ১৪১৯ বঙ্গাব্দ অব্দি তো এসেছে। গরমের ছুটিতে যখন দিদার বাড়ি গিয়ে কদিন থাকতাম, ভোরবেলা নানারকম আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেত জলের ভারী আসত, রাস্তা দিয়ে ফেরিওয়ালা, জমাদার, গঙ্গায় লঞ্চ ধরতে যাওয়া অফিসযাত্রী, ঢাকা বারান্দায় কাজের মাসি বাসন্তীদির টুংটাংখটখট বাসন মাজা, পুরনো আমলের ফ্ল্যাটবাড়িতে কমন পাম্প চালানো নিয়ে ভাড়াটেদের কাজিয়া, ইত্যাদি প্রভৃতি। ঘুম ভেঙেও মটকা মেরে পড়ে থাকতাম যতক্ষণ না মা এসে তুলে দিত জোর করে। তারপর দিদার ভাঁড়ার থেকে লম্বা মোটা বান, তাতে রাংতায় মোড়া নরম মাখন দেওয়া, অথবা কোনোদিন পরোটা আর সাদা আলুচচ্চড়ি, সঙ্গে বাড়ির নীচের মিষ্টির দোকান থেকে আনা সদ্য গরম জিলিপি বা রসগোল্লা। দাদুর প্রিয় নাতনি হওয়ার দরুণ ভোরবেলাই এইসব সুখাদ্য আমার জুটত। ওখানে দিনের যে সময়ে প্রাতরাশ সারা হয়ে যেত, নিজের বাড়িতে সেই সময়টা আমার জন্যে ভোরই ছিল। তিনতলার বারান্দা থেকে ভোরের গঙ্গার ধার দেখতে পাওয়াটাও ওখানে যাওয়ার একটা অন্যতম আকর্ষণ ছিল।

আরেকটু বড় বয়েসে ভোর ছিল শুধু রবিবারে ওঠা, আঁকার ক্লাসে যাওয়ার জন্যে। উঠে তৈরি হয়ে গিয়ে আঁকা শিখে আবার ফেরারও তাড়া থাকত, সকাল নটার চন্দ্রকান্তাদেখার জন্যে, সাথে প্রাতরাশে রবিবারস্পেশাল লুচিআলু চচ্চড়িজিলিপি। রবিবার দিনটাকে অন্যদিনের তুলনায় বেশ দীর্ঘ মনে হত ভোরে ওঠার দরুণ। পরপর চন্দ্রকান্তা, মহাভারত/রামায়ণ, জাঙ্গল বুক, ইত্যাদি দেখতাম সারা সকাল, রবিবার বলে পড়ার ছুটি। এরপর দিলাম জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা, দিয়ে চলে এলাম কলকাতায়।

তারপর থেকে শুরু হল সেই অত্যাচার যাকে মর্নিং স্কুল বলে। শুরুর কদিন কাকার বাড়ি থেকে মায়ের সাথে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে বাসট্রাম ধরে রাস্তা চেনার জন্যে যাতায়াত করলাম। পরে স্কুল বাসে ভর্তি হওয়াতে একটু সুবিধে হল, তবে সময়টা আরো এগিয়ে এল। আমার মত ঘুমকাতুরের পক্ষে সকাল ছটায় উঠে তৈরি হয়ে নাকেমুখে দুধকর্ণফ্লেক্স গুঁজে গলির মুখে বাসের জন্যে অপেক্ষা করা যে কী দুষ্কর ব্যাপার সে ব্যাথা বোঝে কি আনজনে…’। তবে ওই দুবছরে দক্ষিণ কলকাতার ভোরদের (হ্যাঁ, বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ভোর) খুব ভাল করে চিনে গেছিলাম। গ্রীষ্মকালে জলে ধোয়া রেড রোড দিয়ে হু হু করে যেতে যেতে হাওয়ায় আবার ঘুম পেয়ে যেত। ভবানীপুরের বনেদি বাড়ি থেকে হাজরার আধুনিক ফ্ল্যাটদের  জেগে ওঠা দেখতে দেখতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় দিব্যি কেটে যেত। শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কচুরিসিঙাড়াজিলিপির নানাবিধ গন্ধে প্রাতর্ভ্রমণকারীদের সঙ্গে আমাদের মনও আনচান করে উঠত। বর্ষায় জুতোমোজা খুলে হাতে নিয়ে বাসে উঠতাম কারণ আমাদের রাস্তায় একহাঁটু জল জমেই থাকত। তবে স্কুল ছুটির পর ওই জুতোমোজা পরেই ছপাত করে বাস থেকে গলির মুখে জলের মধ্যে লাফ মারতাম। বৃষ্টিভেজা কলকাতার একটা আলাদা রূপ আছে যেটা অন্য কোনো শহরে পাওয়া যায় না। দুর্গাপুজোর আগের ভোরগুলোতে পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হয়ে যেত। আর শীতকালে কুয়াশাঢাকা ভোরে একেকটা রাস্তা্র আস্তে আস্তে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠা দেখতাম আমাদের বাসের আলোয়। বকুলবাগানের বড় বড় গাছগুলো মাথাভর্তি কুয়াশা নিয়ে আমাদের কুর্ণিশ করত ভোর ভোর।

এখন শৈশবকৈশোরের ভোরকে ছুটি দিয়ে তরুণী ভোর দেখি। প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে যাদবপুরের গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে অন্য চোখে ভোরকে দেখি। আমাদের ঝিলের ধারের কটি পাড়া এখনও সে অর্থে পশহয়ে যায়নি। চারপাঁচতলা ঝাঁচকচকে ফ্ল্যাটের পাশাপাশি ঘরোয়া একতলাদোতলা বাড়ি এখনও আছে, তাকে ঘিরে ছোট্ট উঠোনে ফুলের টব, রাস্তায় টিউবওয়েল। ভোরবেলা কোনো বাড়ি থেকে মুসুর ডালে সম্বার দেওয়ার গন্ধ ভেসে আসে, কোনো বাড়ি থেকে স্কুল/অফিসযাত্রীদের জন্যে মাছভাজার, কোনো বাড়িতে নতুন হন্ডা সিটি গাড়ি ধোয়া চলে, কোনো বাড়ির ধেড়ে ছেলে অফিস বেরোবার সময়ে তার মা চিৎকার করেন, ‘ছোটন, হেলমেটটা নিয়ে যা,’ কোনো বাড়ির রকের সামনে ম্যাক্সিপরিহিতা মাসিমা মাছউলির সাথে দরাদরি করেন, কোনো বাড়ির গ্রিলঘেরা বারান্দায় শান্তসৌম্য বৃদ্ধ বসে খবরের কাগজ পড়েন। এইসবের মধ্যেই কোথাও পুরনো দিনের ভোরেরা নতুনের সঙ্গে মিশেও হারিয়ে যায় না এখনও, শুধু কলকাতাতেই।

Advertisements
 
3 Comments

Posted by on March 22, 2013 in রচনা

 

Tags: , , ,

3 responses to “আহির ভৈরোঁর টানে

  1. Minko

    March 23, 2013 at 10:51 PM

    bhor byapar-taa niye aamar chokhkhu-korner bibaad-bhonjon ekhono holonaa. tor lekhaay aahir-bhairabi’r ullekh dekhe mawne holo, aarey! bhor-ke toh sheybhabe dekhini konodin, shunechhi kebol! shesh-raat-ey Amir Khan-er aalapey, kimba Budhdhadeb Dasgupta-er jhaala’r kaaje.
    maatro ekbaar, jokhon baachhur theke bawlod hoye uthechhi, kono ekta kaaj-ey shaat-shawkaale college street jete hoyechhhilo. Bus-ey uthechhilam. shaamney, ishkool-baalikati bosahechhilo, taake dekhe aar gontobye jawa hoyni sheydin. jhnaa-chawkchawke IISWBM chhere, sheydiner shokaal dupurer’r gaa-ey dholey porechhilo South Point-er shaamney. biliti uponyashh-er Rebecca Sharp-ey shei aamar prothom, ebong shesh, dyakha. ei aajob shawhorey.
    shudhu eituku’r jonyei kolkata’r bhor-ey kaachhe aamar naara bnadha. ekhono.

     
  2. Anunoy Samanta

    April 1, 2013 at 9:28 PM

    Surur shiuli phool kurono theke seser school-jatrir jonyo macch bhaja, purotai boddo chena chena laglo…. ebong ek kothay osadharon bhalo laglo apnar lekhar style!
    apatoto nijer blog e NaPoWriMo 2013 (30 poems in 30 days) niye ektu katrani khacchi, tai ektu besi rokom somoy niye apnar porichonno blogtike review korar siddhanto nilam 🙂
    tobu du ek kotha na bole parchina… apnar bangla-font ta porte chokhe bes jor porche… ektu well spaced r boro kora jaynaki lekhagulo?
    ar dwitiyo boktobyo holo apni eto kom lekha post koren keno bangla blog e? kom lekhen naki kom post koren??
    Bhalo thakun………..

     
  3. pridreamcatcher

    April 2, 2013 at 8:12 PM

    অনুনয়,

    এই ব্লগের থিমে বাংলা ফন্ট বেশ ছোট আসছে, বড় করার যারপরনাই চেষ্টা করব এবার থেকে। আর আমি বাংলায় মূলতঃ গল্প-কবিতা লিখি, ওগুলো সময় করে দেখবেন ওপরের ট্যাবগুলিতে আছে। রচনা/প্রবন্ধে এখনো ঠিক হাত পাকেনি বোধহয়, তাই কম পাচ্ছেন আপাতত, আরো লিখব সময়-সুযোগ করে এবং লেখা ‘পেলে’।
    এত ব্যস্ততার মধ্যেও পড়ে মন্তব্য রাখার জন্যে আপনাকে অসীম ধন্যবাদ।

    🙂

     

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

 
feeble Lines

- By Adarsh

Natasha Ahmed

Author at Indireads

জীবনের আয়না

কিছু এলোমেলো ভাবনাচিন্তা

ব্লগম ব্লগম পায়রা

এটা-সেটা লেখা-দেখা...কখনো আনমনে কখনো সযতনে, টুকিটাকি আঁকিবুঁকি...সাদা-কালো সোজা বাঁকা

translations

translations of contemporary, modern and classic bengali fiction and poetry by arunava sinha

Cutting the Chai

India's original potpourri blog. Since 2005. By Soumyadip Choudhury

104.193.143.58/~manjul7/

MANJULIKA PRAMOD - I TRAVEL NEAR AND FAR FOR INTERESTING PERSPECTIVES!

সাড়ে বত্রিশ ভাজা

একটি বাংলা ব্লগ

MySay.in | Political Cartoons and Social Views

Funny Cartoon Jokes on Latest News and Current Affairs.

Of Paneer, Pulao and Pune

Observations | Stories | Opinions

A Bookworm's Musing

Reading the world one book at a time!

SpiceArt

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Abhishek's blog অভিষেকের ব্লগ

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Calcutta Chromosome

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Bookish Indulgenges with b00k r3vi3ws

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

monalisadesign

Monalisa's creations

of spices and pisces

food and the history behind it.

A Little Blog of Books

Book reviews and other literary-related musings

Scratching Canvas

"আমার চতুর্পাশে সব কিছু যায় আসে, আমি শুধু তুষারিত গতিহীন ধারা..."

Sapna's Blog

A civilization is only as great as its dreams

Words. More or Less.

Grey cells in Grayscale.

The Tales Pensieve

World of Indian Reads

%d bloggers like this: